আলোকিত ব্যক্তিত্ব

হযরত আল্লামা শাহ মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল জব্বার (রহ:) এর জীবনী

মাওলানা ওয়াছি উদ্দিন মিয়াজির মেজো সন্তান হযরত আল্লামা শাহ মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল জব্বার (রহ:), পীর সাহেব কেবলা, বায়তুশ শরফ, চট্টগ্রাম। তার আরেক নাম মাওলানা। খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতাব্দী হতে এদেশে ধর্ম প্রচারের জন্য অনেক আরব বণিক ও সুফী সাধক আসেন। আগত সুফি সাধকের দ্বারা দেশে পরিবারের উদ্ভব ঘটে। তার মধ্যে মিয়াজি পরিবার অন্যতম। সে মিয়াজি পরিবারের একজন হলেন মাওলানা ওয়াছি উদ্দিন মিয়াজি। চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার বড়হাতিয়া ইউনিয়নের মিয়াজি পাড়ার তাঁর স্থায়ী নিবাস। তাঁর বংশগত উপাধি মিয়াজি। তাঁর বংশের নামানুসারে এলাকার নামকরণ হয় মিয়াজি পাড়া।

মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড থেকে কামিল আল হাদিস পাশ করেন বলেই তাঁর শিক্ষাগত উপাধি মাওলানা। ঐতিহাসিকদের মতে পীর সাহেব কেবলার পূর্বপুরুষ আরব বংশদ্ভূত। ১৮৫২ সালে আরকানসহ দক্ষিণ বার্মা ব্রিটিশ সম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্তির পর সামুদ্রিক জাহাজ মাঝি-মাল্লা, সারেং প্রভৃতি পদে চট্টগ্রামের মুসলমানদের চাকুরী দেওয়া হতো। ফলে বর্তমান মিয়ানমারের আকিয়াবে চট্টগ্রাম অঞ্চল হতে মুসলমান গমনের হিড়িক পড়ে যায়। সে সুবাদে মাওলানা ওয়াছি উদ্দিন মিয়াজির বিয়ের আড়াই বছর পর প্রথম পুত্র আবদুল কুদ্দুসসহ সস্ত্রীক বার্মায় গমন করেন। ১৯৩৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারী বর্তমান মিয়ানমারের থাংগু জেলায় কালাবস্তি বাঙালি কলোনিতে হযরত আল্লামা শাহ মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল জব্বার (রহ:) এশার নামাজের জামাত চলাকালীন সময়ে জন্মগ্রহণ করেন। হযরত আল্লামা শাহ মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল জব্বার (রহ:) এর মাতা লোহাগাড়া উপজেলার বড়হাতিয়া ইউনিয়নের ইয়াছিন পাড়ার আমতলী গ্রামের সিকদার বংশের ভাগ্যবতী মহিলা ফিরোজা খাতুন।

হযরত আল্লামা শাহ মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল জব্বার (রহ:)’র বয়স যখন ২ মাস তিন সপ্তাহ তখন তাঁর মা স্বপ্ন দেখলেন তাঁর সন্তান দুধ পান করছে। হঠাৎ মাওলানা দুধ ছেড়ে দিয়ে চোক বড় বড় করে উপরের দিকে তাকিয়ে আল্লাহ, আল্লাহ শব্দটি খুব স্পষ্টভাবে বলেছেন। অপরদিকে মাওলানা’র বয়স ঠিক ৩ মাস হলে তখন উঠানে দোলনায় থাকা মাওলানা দোলনায় কাৎ হয়ে আল্লাহ, আল্লাহ বলে জিকির করেছেন। এ জিকির তাঁর মা ও আমিরাবাদের নুরুদ্দিন ফকির স্পষ্টভাবে শুনতে পায়। ৬ মাস বয়স পর্যন্ত এই জিকির তিনি করতেন। তারপর আর এই জিকির শোনা যায়নি। আড়াই বছর বয়সে তাঁর পিতা এক কঠিন রোগে আক্রান্ত হন। সুচিকিৎসার জন্য বার্মার রেঙ্গুন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সুস্থ না হওয়ায় তিনি ১৯৩৬ সালে নিজ এলাকা বড়হাতিয়ার মিয়াজি পাড়ায় চলে আসেন। রোগে আক্রান্ত অবস্থায় ২/৩ মাস পর তিনি নিজ বাড়িতে ইন্তেকাল করেন। পিতার মৃত্যুর পর অসহায় কিশোর আব্দুল জব্বার (রহ:) এর মাতা ফিরোজা খাতুন তাঁর একমাত্র অভিভাবকে পরিনত হন।

হযরত আল্লামা শাহ মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল জব্বার (রহ:) অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। আরবী, ফার্সী, উর্দু ও বাংলা ভাষায় অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন তিনি। তাঁর মুর্শিদ ছিলেন কুতুবুল আকম শাহ সুফী হযরত মাওলানা মীর আখতার (রহ:)। মাওলানার মুর্শিদ একজন আধ্যাত্মিক জ্ঞানসম্পন্ন কামেল মানুষ ছিলেন। মাওলানা যখন আলিম ক্লাসে পড়তেন তখন তাঁর মুর্শিদ গারাঙ্গিয়া মাদ্রাসার বার্ষিক সভায় প্রধান মেহমান হিসেবে আসেন। এ সভায় মাওলানার পরিবেশিত না’ত শুনে তাঁর মুর্শিদ তাঁকে পূর্ণ স্নেহের মায়াবন্ধনে আবদ্ধ করে ফেলেন। যখন তাঁর মুর্শিদ বড়হাতিয়ার কুমিরাঘোনায় এসেছেন তখনও মাওলানাকে খুজেন। তাঁর না’ত শুনতেন। আরেকদিন মাওলানার না’ত শুনে মুর্শিদের চেহারার রং পরিবর্তন হয়ে অন্যরূপ ধারণ করে। বেঁহুশ অবস্থায় মাঠিতে পড়ে যায়। মাওলানার সাথে তাঁর মুর্শিদের সাক্ষাতের পর থেকে সময়ে-অসময়ে মাওলানার না’ত শুনে মাওলানার নিজেট অজান্তে মুর্শিদের সুনজরে আসেন। এমনকি সাতকানিয়া গারাঙ্গিয়ার হযরত শাহ মাওলানা আবদুল মজিদ (রহ:) সাহেব প্রকাশ বড় হুজুর, চট্টগ্রাম শাহী জামে মসজিদের পেশ ইমাম আওলাদে রাসূল (স:) ছৈয়দ আবদুল আহাদ মাদানীও মাওলানাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। অবশেষে ১৯৪৮ সালে আলিম প্রথম বর্ষে অধ্যয়নরত অবস্থায় পবিত্র শবে-বরাত’র রজনীতে তাঁর মুর্শিদ মাওলানা মীর মোহাম্মদ আখতার (রহ:) তাঁকে বয়াত করান। চট্টগ্রাম ষ্টেশন মসজিদে মুর্শিদের হুজটাখানায় মুর্শিদের নির্দেশে মাওলানা না’ত শুনালেন। তখন তাকে মুর্শিদ বুকে জড়িয়ে ধরে প্রাণভরে দোয়া করেন। বিদায় দেওয়ার প্রাক্কালে উপস্থিত সকলকে লক্ষ্য করে বললেন তোমরা সকলে হযরত আল্লামা শাহ মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল জব্বার (রহ:) কে সম্মান করবে। লোহাগাড়া উপজেলার দরবেশহাটের উত্তর পাশে মাওলানা ও মুর্শিদ এক মাহফিলে যাচ্ছিলেন। যাত্রাপথে মাগরিবের নামাজ শেষে শাহপীর (রহ:) এর মাজার জেয়ারত করেন। জেয়ারতের এক পর্যায়ে মুর্শিদ উপস্থিত সকলকে বললেন শাহপীর আউলিয়ার মধ্যস্থতায় সাইয়্যেদুনা হযরত গৌছে পাকের পক্ষ থেকে বাতেনী সংবাদ তোমাদের নিকট আব্দুল জব্বার নামের যে ছেলে দাঁড়িয়েছে সে আমার রুহানি ছেলে। মুর্শিদের নির্দেশে পাঁচলাইশ ওয়াজেদিয়া মাদ্রাসার মোহাদ্দেসের চাকুরী চেড়ে চট্টগ্রামের কদমতলীতে মুর্শিদের সান্নিধ্যে চলে আসেন। তখন থেকে মুর্শিদের সাথে মাওলানার ভাব বিনিময় হয়। শুরু হয় মাওলানার কঠিন অনুশীলন। সমগ্র রজনী মাওলানা আল্লাহর জিকির ও ইবাদাত বন্দেগীর মাধ্যমে অতিবাহিত করতেন। এভাবে তিনি কঠোর সাধনায় মারফতের প্রগাঢ় জ্ঞানের অধিকারী হয়ে আল্লাহর নৈকট্য লাভে সমর্থন হন। হযরত মীর মোহাম্মদ আখতার (রহ:) তাঁর খেলাফতের দায়িত্ব অর্পণের জন্য হযরত আল্লামা শাহ মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল জব্বার (রহ:) কে গড়ে তুলেন। তাঁর মুর্শিদ তাঁকে কুতুবুল আখতার অর্থাৎ কুতুবদের কুতুব বলেছেন। মাওলানার মুর্শিদ উপস্থিত সকলকে মাওলানার পেছনে মোনাজাত করতে বলতেন। ভবিশ্যতে সবাইকে মাওলানার পেছনে থাকতে হবে বলতেন। মাওলানার মুর্শিদ চট্টগ্রামের মাদার বাড়িতে তাঁরই কাছের মসজিদে পবিত্র জুমার নামাজ আদায় করতেন। প্রতি বৃহস্পতিবার মাগরিবের নামাজের পর তাঁর মুর্শিদ কর্তৃক জিকির ও দোয়া মাহফিল হত। মাওলানার মুর্শিদ ভক্তদের অভিপ্রায়ে একটি মসজিদ নির্মানের উদ্যোগ নিলেন। ১৯৬৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মসজিদ নির্মাণের কাজ শুরু হয় এবং ২১ নভেম্বর বৃহস্পতিবার রাতে উক্ত মসজিদে বাইতুশ শরফে প্রথম তারাবী শুরু হয়।২২ নভেম্বর মাওলানার মুর্শিদের ইমামতিতে জুমার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। সেদিনই তাঁর মুর্শিদ এ মসজিদের নাম ঘোষনা করেন মসজিদে বায়তুশ শরফ। মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা কুতুবুল আলম শাহ সুফী হযরত মাওলানা মীর আখতার (রহ:) ১৯৭১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারী সৌদি আরবে পবিত্র হজ্ব পালনকালে ইন্তেকাল করেন। ইন্তেকালের আগে তিনি খেলাফতের দায়িত্ব হযরত আল্লামা শাহ মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল জব্বার (রহ:) এর উপর অর্পন করেন। দায়িত্ব পেয়ে তিনি ইসলামের মশাল নিয়ে ধর্মসংস্কারক হিসেবে এগিয়ে যান। তিনি সমাজ থেকে মদ-জুয়া, ব্যভিচার-শিরক, বিদআত দূর করতে তৎপর ছিলেন। উদাহরণ সরূপ, লোহাগাড়া উপজেলার দরবেশ হাট এলাকায় বার আউলিয়ার এক অলী হযরত শাহপীর (রহ:) এর মাজারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন যাবৎ ওরশের নামে অশালীন নাচ-গানের আসর হতো। শরীয়ত বিরুধী কর্মকান্ডে লিপ্ত থাকত। মাওলানা তার স্বীয় জাগতিক ও আধ্যাত্মিক শক্তির প্রভাবে এসব কর্মকান্ড উচ্ছেদ করে সেখানে ওয়াজ-নছিহত ও মিলাদ মাহফিলের ব্যবস্থা করলেন। বড়হাতিয়ায় প্রতিবছর ১২-১৩ বৈশাখ বলি খেলা অনুষ্ঠিত হত। দীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে এ বলি খেলা হয়ে আসছিল। স্থানীয় প্রভাবশালী মরহুম ছিদ্দিক আহমদ চৌধুরী এটির প্রধান পৃষ্টপোষক ছিলেন। মাওলানা ১৯৭৭ সালে বলি খেলা বন্ধ করে ঐ স্থানে ১১-১২ বৈশাখ (১৯৭৭ সাল থেকে)   সীরত মাহফিলের আয়োজন করেন। জাবালে সীরত বা সীরতের পাহাড় হিসেবে এ পাহাড় বেশ পরিচিতি লাভ করে।

হযরত মাওলানা আবদুল জব্বার (রহ:) তথাকথিত কোন পীর ছিলেন না। তিনি একজন সংস্কারক ও মহৎ প্রাণ আলেম ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি জীবদ্দশায় অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা, মসজিদ, এতিমখানা, দাতব্য চিকিৎসালয়, সেবা ও কর্মসংস্থানমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেন। তিনি ইসলামী ব্যাংক, চট্টগ্রাম ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা পালন করেন। তিনি অনেক গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি ১৯৯৮ সালের ২৫ মার্চ সকালে ইন্তেকাল করেন। পরদিন ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে চট্টগ্রাম পলোগ্রাউন্ড মাঠে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের উপস্থিতিতে তার নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় বাইতুশ শরফ মসজিদ ও বাইতুশ শরফ আদর্শ আলীয়া মাদ্রাসার মধ্যবর্তী ফুল বাগানের সামনে মাওলানাকে চিরন্তন শয্যায় শায়িত করা হয়।

সূত্রঃ লোহাগাড়া ইতিহাস ও ঐতিহ্য বই;
লেখকঃ মোহাম্মদ ইলিয়াছ

About the author

lohagarabd

2 Comments

  • যেভাবে বলা হলো মরহুম ছিদ্দিক আহমদ চৌধুরী তাঁর প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন বলা হলেও মরহুম আবদুল জব্বার শাহ (রহঃ) হুজুর তাঁরই পরিবারের সকল সদস্যের সম্মতিতে বলী খেলা স্থলে মাহফিল আহবান করেন।কাজেই,মরহুমের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার সুযোগ নাই।তাঁর নিজ হাতে লেখা অসংখ্য চিঠিতে তৎকালীন মানুষের প্রতি ভালোবাসা ফুঁটে উঠে।তিনি নেহাত জনদরদী জমিদার ছিলেন।এলাকার মুরব্বিদের অনেকেই সে বিষয়ে অবগত থাকবেন।

    • আপনার মতামতের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। আমাদের লেখনীর মাঝে ভুল হয়ে থাকলে আপনি সচেতন মানুষ হিসেবে সঠিক তথ্যটি আমাদের কাছে প্রেরণ করুন। আমরা সত্য প্রকাশে বিশ্বাসী। তারপরও যদি ভুল হয়ে থাকে সেটাকে আমরা সংশোধন করব।
      লেখা পাঠান নিচের ঠিকানায়ঃ lohagarabd.com@gmail.com
      পাশে থাকুন।

Leave a Comment