স্মৃতিচারণ

প্রাণের স্কুলের গৌরবের ৮০ বছরঃ

গত ২০শে জানুয়ারি ২০১৮, রোজ শনিবার দক্ষিণ চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ দক্ষিণ সাতকানিয়া গোলামবারী মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের(পূর্বনাম দক্ষিণ সাতকানিয়া গোলামবারী উচ্চ বিদ্যালয়) ৮০ বছর পূর্তি উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হয়েছে ৮০ বছর পূর্তি ও অভিভাবক পুনর্মিলনী। এতে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব, লোহাগাড়ার সূর্য সন্তান মেজর জেনারেল মিয়া মুহাম্মদ জয়নাল আবেদীন, বীর বিক্রম, পিএসসি এবং চট্টগ্রাম ১৫ আসন(লোহাগাড়া-সাতকানিয়া) এর মাননীয় সংসদসদস্য আবুরেজা মুহাম্মদ নেজামউদ্দীন নদভী সহ সহ আরো অনেকেই।
চট্টগ্রামের প্রাচীনতম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এটি যেমন সুপরিচিত ঠিক তেমনি শিক্ষার মানের দিক থেকেও অত্র স্কুল অনেক সুনাম অর্জন করেছে। গত ৬ যুগেরও বেশী সময়ে এখান থেকে বের হয়েছে বহু গুণীজন। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম পড়েছে অত্র বিদ্যালয়ে। অত্র স্কুলের বহু প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা দেশ-বিদেশে সুনামের সাথে নিজেদেরকে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত রেখেছেন। এছাড়াও অত্র স্কুলের অনেক প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা দেশের শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজও পড়াশোনা করছেন। অনেকেই আবার উচ্চশিক্ষা নিতে বিদেশেও পড়াশোনা করছেন। চট্টগ্রামে একি বাউন্ডারির ভেতর প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক পর্যন্ত পুরনো স্কুলের সংখ্যা হাতেগুনা কয়েকটি। তার মধ্যে এটি অন্যতম।
এলাকার কৃতি সন্তান মরহুম আশরফ আলী চৌধুরীর হাত ধরে এবং এলাকার কিছু শিক্ষানুরাগী মানুষের সহযোগিতায় ১৯৩৭ সালে তৎকালীন বৃহত্তর সাতকানিয়া থানায় এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। মরহুম আশরফ আলী চৌধুরীর পিতার নামানুসারে স্কুলের নামকরণ করা হয়। উল্লেখ্য ইংরেজ শাসনামলে যে তিনটি মাত্র স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এটি তার মধ্যে অন্যতম। সাতকানিয়া বিভক্ত হয়ে লোহাগাড়া আলাদা থানা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলে আমিরাবাদ ইউনিয়নে লোহাগাড়ার প্রথম প্রতিষ্ঠিত স্কুল হিসেবে এটি খ্যাতিলাভ করে। ১৯৩৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এটিকে প্রথম স্বীকৃতি প্রধান করে। কিছুদিন আগেও দূর দূরান্ত থেকে এখানে বহু শিক্ষার্থী জ্ঞান আহরণের জন্য আসতো। দূরদূরান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থীর সিংহভাগ কক্সবাজার জেলা থেকে এখানে পড়তে আসতো বলে লোকমুখে শুনা যায়। তখন দূরদূরান্তের এই শিক্ষার্থীদের থাকার জন্য ছাত্রাবাসের ব্যবস্থা ছিলো। কালের বিবর্তনে শিক্ষার প্রসার হতে থাকলে দূর থেকে পড়তে আসা শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যায়। তবে এখনো সমান সুনামের সাথে কালের সাক্ষী হয়ে ৮০ বছরের পুরনো স্কুলটি সবার কাছে সুপরিচিত।
প্রাণের এ স্কুলে আমার মতো একজনের পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেছি প্রাণের এ স্কুলে। এখনো সে প্রাণের শিক্ষক, বন্ধুদের কথা মনে আছে। চোখের সামনে ভাসে ভোরে স্কুলে যাওয়ার আনন্দময় দৃশ্য, প্রত্যহ সমাবেশ, ক্লাসের ফাঁকে বন্ধুদের চিল্লাচিল্লি, আড্ডাবাজি, দুষ্টুমি, দুপুরে বিরতিতে মসজিদে নামাজ পড়া, টিফিনে বন্ধুদের সাথে নাস্তা করা, খেলাধুলা করা, স্কুল পালানো আরো কত স্মৃতি প্রতিনিয়ত মনে পড়ে। আমি ছিলাম ২০১১ ব্যাচের। স্কুল জীবন শেষ করার পর এই ৬ বছরে অনেক বন্ধুরা প্রবাসী হয়েছো। আমার মতো বেশীরভাগ বন্ধুরা শহরে পাড়ি জমিয়েছো। গত বছর আমরা প্রায় ৭০ জন বন্ধুরা পুনর্মিলন হয়েছিলাম। এবারও হয়তো আরো বিশাল আকারের এই বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে তোমরা অনেকেই একত্রিত হয়েছো। কিন্তু আমি, আমরা অনেকেই কর্মব্যস্ততার কারণে হয়তো আসতে পারিনি। প্রাণের স্কুলে সবাই মিলে একত্রিত হওয়ার মজাটাই অন্যরকম। হয়তো তোমরা কিছুক্ষণের জন্য ভুলে গিয়েছিলে তোমরা শৈশবের সেই স্কুলকে ছেড়েছো।
অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলেও যেটা আমি ব্যক্তিগতভাবে দেখেছি প্রাণের এই স্কুল থেকে বেরিয়ে অনেকে অনেক জ্ঞানী, গুণী হলেও হাতেগুনা কয়েকজন ছাড়া তেমন কেউ স্কুলের খবরাখবর রাখেন না। শতবর্ষ পূর্তি উৎসবের প্রস্তুতি উপলক্ষ্যে ২০১৬ সালে স্কুলে একটি বৈঠক হয়েছিলো। যেখানে মাত্র কয়েকটি ব্যাচের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। অথচ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি চাচ্ছেন একটি বড় ধরণের অনুষ্ঠানের আয়োজন। আমার মনে হয় এই বিশাল আয়োজনকে সামনে রেখে প্রাক্তন সব শিক্ষার্থীদের ব্যাচ অনুসারে আলাদা বৈঠক করা জরুরী। প্রাণের এ স্কুল কালের সাক্ষী হয়ে বেঁচে থাকুক হাজার বছর। আসুন প্রাণের স্কুলের ৮০ বছর পূর্তিতে এটাই হোক সবার দৃঢ় অঙ্গীকার

এম. তামজীদ তাহসিন,
লোহাগাড়া, চট্টগ্রাম।
এসএসসি-২০১১ ব্যাচ।

About the author

lohagarabd

Leave a Comment