উন্মুক্ত পাতা

আজ লেখক আহমদ ছফার জন্মদিনঃ হিযবুল্লাহ রায়হান

Written by lohagarabd
১৯৪৩ সালের ৩০শে জুন চট্টগ্রামের গাছবাড়িয়ায় প্রত্যন্ত এক গ্রামে ছেলেটির জন্ম। কাঠমিস্ত্রি ও কৃষক বাবার সন্তান হওয়া নিয়ে কখনো হীনমন্যতা ছিলনা তার। বাবার সহযোগিতায় সে স্কুলে অধ্যয়নরত অবস্থায় কমিউনিস্ট পার্টির সভাস্থলে আসা-যাওয়া শুরু করলো। বড় ভাইয়ের বিয়েতে জীবনে প্রথম বিড়ি খাওয়া শিখলো।
লিকলিকে গড়নের হওয়ায় গাছে উঠে পাখির বাসা খোঁজে বেড়ানোর শখ ছিল তার। পাখির ছানা এনে খাঁচায় পুষতো। একবার হিন্দু সম্প্রদায়ের কালিমন্দিরে গিয়ে রামায়ণ আর মহাভারত গ্রন্থের উপর চোখ পড়লো। ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও ঠাকুরমশাই অনুমতি না দেওয়ায় বই দুটি পড়া হলনা।
কিন্তু ছেলেটি নাছোড়বান্দা। ফন্দি করে একদিন কালিমন্দির থেকে বই দুটি চুরি করলো। কিন্তু পরবর্তীতে ঠিকই ধরা পড়ে যায় এবং এই ঘটনা আরও কিছুদূর গড়িয়ে শেষপর্যন্ত বাবার হাতে বেদম মার খেল।
হাতখরচ মেটানোর জন্য নিজের বাড়ি থেকে ধানের বস্তা বিক্রি করে বেশ কয়েকবার ধরা পড়লো। বাবা রেগে গিয়ে বলতেন, এই ছেলে আমার বংশের কলঙ্ক। বড় হয়ে নামকরা চুর হবে।
শৈশবে পকেটে দিয়াশলাই নিয়ে ঘুরে বেড়ানো এই ছেলেটি সুযোগ পেলেই কারও ক্ষেতের বেড়ায় বা খড়ের স্তুপে আগুন লাগিয়ে দিত। তারপর দূরে কোথাও বসে সে আগুন উপভোগ করতো। বাড়িতে যথারীতি নালিশ আসতো এবং বাবা ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য হতেন।
গাছবাড়িয়া হাই স্কুলে পড়াকালীন সময়ে রাজনীতি সম্পর্কে অল্পবিস্তর জ্ঞানার্জন করায় কলেজে জীবনে গিয়ে পুরোপুরি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়লো সে।
কানুনগোপাড়া কলেজে পড়ার সময় একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে কয়েকজন বন্ধুদের সাথে ছেলেটিও চট্রগ্রাম-দোহাজারি রেললাইন উপড়ে ফেলার কাজে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল।
এই ঘটনার পর সেই কলেজে পড়াশোনা চালিয়ে যাবার পথ রুদ্ধ হয়ে গেল। পুলিশের হাত থেকে বাঁচার জন্য রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ির দুর্গম পাহাড়ি পথ কখনো হেঁটে, কখনো নৌকায় পাড়ি দিতে হয়েছে। খাবার ও নিরাপত্তার জন্য দিনের পর দিন পাহাড়ে ঘুরে বেড়াতে লাগলো।
অবশেষে শ্রমের বিনিময়ে অন্নের দেখা পেয়েছে সে। বাড়িতে আরাম-আয়েশ করে দিনযাপন করা ছেলেটাকে বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মোষের হাল বাইতে হল। হাল বাইতে গিয়ে হাতের আঙ্গুলে যে কড়া পড়েছিল, সেগুলো আজীবন ছিল তার।
অবশ্য মোষের হাল বেশিদিন বাইতে হয়নি। সেই পাহাড়ি গ্রামে কোন এক স্কুলে উর্দু শিক্ষকের ঘাটতি হওয়ায় ছেলেটি সরাসরি দিনমজুর থেকে শিক্ষক হিসেবে প্রমোশন পেয়ে গেল।
১৯৬২ সালে নাজিরহাট কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করলো এবং একই বছর চট্টগ্রাম ছেড়ে ঢাকায় চলে আসলো সে।
ঢাকায় এসে প্রথমে ঢাকাইয়া এক বন্ধুর বাসায় এবং পরবর্তীতে এস এম হলে আবুল কাসেম ফজলুল হকের সঙ্গে সময় কাটছিল।
ইতিমধ্যে ছেলেটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়েরছাত্র ছিল বটে, তবে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মনীতি তোয়াক্কা করতো না কখনোই। গ্রাম থেকে জমি বিক্রি করা টাকা পাঠাতেন বাবা, কিন্তু ছেলে আরাম-আয়েশ করে সব টাকা নিমিষেই খরচ করে ফেলতো। শেষে ধার দেনা করে দিনযাপন করতে হচ্ছিল।
সদ্য গ্রাম থেকে আসা একটা ছেলেকে কেন মানুষ একাধিকবার মুক্তহস্তে আর্থিক সহায়তা দিতেন, সে রহস্য অজানা রয়ে গেল।
পাঠক হয়তো এতক্ষণে কিছুটা হলেও আঁচ করতে পেরেছেন আমি কাকে ছেলে সম্ভোধন করে লেখাটা লিখছি।
হ্যাঁ, তিঁনি আর কেউ নন। তিঁনি আমাদের কালের নায়ক ‘আহমদ ছফা।’
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়াটা ছিলো একটা উপলক্ষ, ওনার আসল লক্ষ্য ছিলো লেখক হওয়া। বিভিন্ন জায়গায় প্রত্যাখাত হওয়ার পর তাঁর প্রথম লেখা উপসম্পাদকীয় কলাম “কর্ণফুলীর ধারে” দশ কিস্তিতে প্রকাশিত হয়েছিল ‘সংবাদ’ পত্রিকায়।
সত্যেন সেনদের সঙ্গে আড্ডায় ‘নটি কর্নার’-এ বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ধরেই তিঁনি লিখেছেন প্রথম উপন্যাস ‘সূর্য তুমি সাথী।’
সংবাদ পত্রিকায় দুই অধ্যায় ছাপানোর প্রায় দুই বছর পর ১৯৬৭ সালে উপন্যাসটি বই আকারে বের হয়।
উল্লেখ্য ওঁনার প্রথম বই ছিলো ‘বরুমতির আঁকে বাঁকে’-যেটা বরুমতি নদীর দু’পাড়ের মানুষ নিয়ে লেখা হয়েছিল। প্রথম অনুবাদ সাহিত্য ‘তানিয়া’-যেটা ঠেকায় পড়ে অনুবাদ করেছিলেন। ব্রাক্ষণবাড়িয়া কলেজ থেকে প্রাইভেটে বিএ পরীক্ষা দেওয়ার জন্য ফরম পূরণের টাকা ছিলো না আহমদ ছফার। তখন কমলাপুর রেলস্টেশনে বসে দুই দিনে রুশ উপন্যাসিক পি লিডভের ‘তানিয়া’ বইটি অনুবাদ করেছেন। সেই অনুবাদ প্রকাশকের নিকট জমা দিয়ে পরীক্ষার ফি জোগাড় করতে হয়েছে।
নিজের নামের বানান কেউ ভুলভাবে লিখুক, এটা মোটেই পছন্দ ছিলো না তার। ‘ছ’-এর জায়গায় ‘স’ ব্যবহার করার কারণে ‘সাপ্তাহিক পূর্বদেশ” পত্রিকার সম্পাদক কাজী মোহাম্মদ ইদ্রিসের সঙ্গে তার প্রচন্ড বাগবিতন্ডা হয়েছিল একবার।
ওঁনার পরামর্শে মুনতাসীরুদ্দিন খান মামুন পরিবর্তন করে প্রফেসর মুনতাসীর মামুন নিজের নাম সংক্ষিপ্ত করেছেন। তদ্রূপ মোহাম্মদ জাফর ইকবাল পরিবর্তন হয়ে মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও সলিমউল্লাহ খান পরিবর্তিত হয়ে ডঃ সলিমুল্লাহ খান হয়েছে।
১৯৬৪ সালে ইসলামী একাডেমী (বর্তমানে ইসলামিক ফাউন্ডেশন) কতৃক প্রকাশিত এবং শাহেদ আলী সম্পাদিত ছোটদের পত্রিকা ‘সবুজ পাতা’-য় তার লেখা প্রথম ছাপা হয়। সোলায়মান (আঃ) এর কাহিনী অবলম্বনে সেই ছোট গল্পটির নাম ছিলো ‘অপূর্ব বিচার।’
পরে এই গল্পটি অষ্টম শ্রেণীর বাংলা বইয়ে সংকলিত হয়েছিল।
ইসলামিক একাডেমীর প্রথম ডিরেক্টর আবুল হাশিম-এর লেখা ‘Creed of Islam’ পড়ে ওনার ভক্ত হয়েছিলেন আহমদ ছফা। আবুল হাশিম-এর বড় ছেলে বদরউদ্দীন উমর বইটার একটা বাংলা অনুবাদ করেছেন ‘ইসলামের মর্মবাণী’ শিরোনামে।
উল্লেখ্য, রামায়ণ ও মহাভারত মুখস্থ করার পাশাপাশি আঠারো পারা কোরআনও মুখস্থ ছিলো আহমদ ছফার।
বার্ট্রান্ড রাসেলের ‘Sceptical Essays’ অনুবাদ করে দৈনিক পাকিস্তানের সম্পাদক আহসান হাবিবের কাছে পাঠালেন ছাপানোর জন্য। কিন্তু কতৃপক্ষ সেটা ছাপালো না। পরে আবু হেনা মোস্তফা কামালের সহায়তায় ১৯৮২ সালে বইটা বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়।
বার্ট্রান্ড রাসেলের সঙ্গে আহমদ ছফার পত্রালাপ হতো তখন।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পুরো শহরে হত্যাযজ্ঞ চলল। পরদিন সকালে পাকিস্তানি সৈন্যের মুখোমুখি পড়ে গেলেও আহমদ ছফাকে সাদামাটা বেশভূষাতে ঝাড়ুদার ভেবে সেনারা কোন এ্যাকশান নেয়নি। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তাঁরই কন্ঠস্বর ধ্বনিত হয়েছিল, ‘মিলিটারিরা সবাইকে মেরে ফেলেছে।’
“ছফারা যুগে যুগে জন্মায় না, একশো বছরে একবারই জন্মায়।”
এই মহাসত্য ছফা নিজেই বলে গিয়েছেন।
আজ ৩০শে জুন, আহমদ ছফার জন্মদিন।
ওনার মতো দুঃসাহসী ব্যক্তির অভাব বাংলাদেশে কখনোই পূরণ হওয়ার নয়।
শুভ জন্মদিন কালের নায়ক।
বিঃদ্রঃ আহমদ ছফাকে নিয়ে আরও অনেক লেখা বাকি রয়ে গেল। সেগুলো পর্যায়ক্রমে লিখতে চাই, এই নক্ষত্রের সাথে আপনাদেরকেও আমার মতো পরিচিত করাতে চাই।
ছফা’কে নিয়ে এটা ১ম কিস্তির লেখা হিসেবে চিহ্নিত করলাম, পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে লিখবো।

About the author

lohagarabd

Leave a Comment