উন্মুক্ত পাতা

আজ লেখক আহমদ ছফার মৃত্যুবার্ষিকীঃ হিযবুল্লাহ রায়হান

Written by lohagarabd
২০০১ সালের ২৮শে জুলাই শনিবার ছিলো, আজকেও শনিবার। এই দিনেই মহাত্মা আহমদ ছফা’কে হারিয়েছে বাংলাদেশ।
কিছুদিন আগে ওনাকে নিয়ে একটা লিখা লিখেছিলাম প্রথম পর্ব হিসেবে। সহৃদয় পাঠকদের কেউ কেউ দ্বিতীয় পর্বের জন্য উন্মুখ ছিলেন, ওনাদের জন্য এই দ্বিতীয় পর্বের লেখা। ছফা সম্পর্কে খুঁটিনাটি কিছু বিষয় এখানে উঠে এসেছে, সাথে রাজনৈতিক পরিস্থিতিও।
১৯৬৮ সালে আইয়ুব খানের সরকার রবীন্দ্র-সঙ্গীত প্রচার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। এর প্রতিবাদে সারাদেশের শিক্ষিত মানুষ মিছিল-মিটিং করলেন। সেই সময় আহমদ ছফার উদ্যোগে তৎকালীন শিল্পকলা একাডেমীর সেক্রেটারি কাজী সিরাজ ও অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের সহায়তায় রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে একটা প্রবন্ধ সংকলন ছাপানোর সিদ্ধান্ত হয়। পরবর্তীতে অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের সম্পাদনায় ‘স্টুডেন্ট ওয়েজ’ থেকে বইটি প্রকাশিত হয়।
একই বছর কবীর চৌধুরীর আগ্রহে বাংলা একাডেমি জার্নালের জন্য ‘Literary ideals in Bengal’ নামে একটি প্রবন্ধ রচনা করেন আহমদ ছফা।
১৯৬৯ সালে আহমদ ছফা ‘স্বদেশ’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা বের করেছিলেন, যেটার সম্পাদক ছিলেন তিনি নিজেই। সেই পত্রিকার সঙ্গে জড়িত ছিলেন বাংলাদেশ সরকারের প্রথম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ডঃ মফিজ চৌধুরী, সরদার ফজলুল করিম, সত্যেন সেন, ডঃ আহমদ শরীফ, মুনতাসির মামুন ও অসীম সাহা এবং আরও অনেক গুনিজন।
১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমির তিন বছরের ফেলোশিপ প্রোগ্রামে আহমদ ছফা পিএইচডি করতে ইচ্ছুক হলেন। তখনকার নিয়ম অনুযায়ী এমএ পাশ না হওয়া সত্ত্বেও আহমদ ছফা সেই বৃত্তিটা পেয়েছিলেন। ওনি গবেষণা করতে চেয়েছিলেন “১৮০০ থেকে ১৮৫৮ সাল পর্যন্ত বাংলায় মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব, বিকাশ এবং বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে তার প্রভাব”-এই বিষয় নিয়ে।
গবেষণা বৃত্তি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আহমদ ছফার সঙ্গে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের পরিচয়।
“যদ্যপি আমার গুরু”-বইতে আব্দুর রাজ্জাক সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ও বিশদভাবে আলোচনা করেছেন আহমদ ছফা। বই এবং টাকা এই দুটি জিনিস যখনই চাইতেন আহমদ ছফা, কখনোই আব্দুর রাজ্জাক খালি হাতে ফিরিয়ে দেননি। একবার আহমদ ছফাকে তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘আপনে এখন কী পড়াশোনা করবার লাগছেন?’
ছফা বললেন, ‘কীভাবে শুরু করবো বুঝতে পারছি না। আপনি যদি কিছু বইয়ের নাম বলে দিতেন।’
আব্দুর রাজ্জাক শব্দ করেই হেসে উঠলেন। বললেন, ‘একই কথা মি. হ্যারল্ড লাস্কিরে কইছিলাম। তিনি লাইব্রেরি দেখিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, মাই বয় গো অ্যান্ড সোক।’
সেই যে আব্দুর রাজ্জাক ছফাকে লাইব্রেরি দেখিয়েছেন, ছফা সেখানে গিয়ে এমনভাবে আকৃষ্ট হয়েছিলেন যে, পরবর্তীতে গবেষণা কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি।
১৯৬৯ সালে আহমদ ছফার একক প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয় সাহিত্য সংগঠন ‘বাংলাদেশ লেখক শিবির।’
লেখকদের প্রতিবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে এই সংগঠন থেকে সাহিত্য পুরস্কারের আয়োজন করেছিলেন তিনি।
১৯৭৩ সালে এই সংগঠন থেকে প্রথম সাহিত্য পুরস্কার প্রদান করা হয়। পুরস্কার পেয়েছিলেন কবি আব্দুল মান্নান সৈয়দ, নির্মলেন্দু গুণ ও হুমায়ূন আহমেদ।
তবে দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে আহমদ ছফার পরিকল্পনা ও শ্রমে গড়ে উঠা ‘বাংলাদেশ লেখক শিবির’ থেকে স্বয়ং ছফাকে বিতাড়িত হতে হয়েছিল। এর পেছনে তিনি বদরুদ্দীন উমরকে দায়ী করেছেন। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে সেই সংগঠন থেকে আহমদ ছফা পুরস্কারের জন্য মনোনীত হলেও তিনি সেটা গ্রহণ করেননি।
১৯৭১সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় আহমদ ছফা আগরতলায় পাড়ি জমান। যদিও তিনি দেশেই থাকতে চেয়েছিলেন, কিন্তু শুভানুধ্যায়ীরা তাকে দেশ ছেড়ে যাওয়ার অনুরোধ করাতে তিনি চলে গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ও কাজী নজরুল ইসলামের বন্ধু কমরেড মুজফ্ফর আহমদের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন আহমদ ছফা। স্বাধীনতা যুদ্ধের গতিবেগ ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধের উপর প্রথম বই ‘জাগ্রত বাংলাদেশ’ লেখার পর কলকাতায় আহমদ ছফার পরিচিতি বেশ বৃদ্ধি পেয়েছিল।
১৯৭১ সালে কলকাতায় মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে আহমদ ছফা ‘সাপ্তাহিক দাবানল’ নামে একটা পত্রিকা বের করেছিলেন। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশেও এই পত্রিকা প্রকাশে সচেষ্ট ছিলেন তিনি। এই পত্রিকাতেই হুমায়ূন আহমেদের প্রথম লেখা কাফকার ‘মেটামরফসিস’ (অনুবাদ) ছাপা হয়েছিল। অনুবাদটির প্রুফ দেখেছিলেন কবি শিহাব সরকার। প্রায় দেড় বছর পর ‘সাপ্তাহিক দাবানল’ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
আহমদ ছফা তরু নামে এক মেয়েকে ভালোবাসতেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় মেয়েটি ভারতে চলে গিয়েছিল এবং সেখানে ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। হাসপাতালেই আহমদ ছফার সঙ্গে তরুর দেখা হল কলকাতা গিয়ে। সুযোগ পেলেই তরুর কাছে ছুটে গিয়ে সেবা করতেন। ১৯৭১ সালের ০৪ঠা ডিসেম্বর পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে পুরো কলকাতা শহরে বিমান হামলার ভয়ে বিদ্যুৎ বন্ধ রাখা হয়। সেই রাতে মারা গিয়েছিল তরু। আহমদ ছফার আত্মজীবনীমূলক তিনটি উপন্যাস হচ্ছে – ‘অলাতচক্র’, ‘পুষ্প বৃক্ষ ও বিহঙ্গ পুরাণ’, ‘অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী’।
‘অলাতচক্র’ উপন্যাসটিতে তরু সম্পর্কে নির্ভেজাল একটি কাহিনী লিখেছেন আহমদ ছফা।
সতেরো কিস্তিতে দৈনিক গণকণ্ঠে প্রকাশের পর ১৯৭২ সালে আহমদ ছফার বিখ্যাত প্রবন্ধগ্রন্থ ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ প্রকাশিত হয়। সেই বইয়ের বিখ্যাত কিছু বাক্য এখনো সমধিক সমাদৃত। তার মধ্যে একটি হচ্ছে –
‘বুদ্ধিজীবীরা যা বলতেন, তা শুনলে বাংলাদেশ স্বাধীন হত না। এখন যা বলছেন, তা শুনলে বাংলাদেশে সমাজ-কাঠামোর আমূল পরিবর্তন হবে না। আগে বুদ্ধিজীবীরা পাকিস্তানি ছিলেন বিশ্বাসের কারণে নয়, প্রয়োজনে। এখন অধিকাংশ বাঙালি হয়েছেন – সেও ঠেলায় পড়ে।’
এই বইয়ের জন্য এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবীর বিরাগভাজন হয়েছিলেন আহমদ ছফা। বইটির প্রচ্ছদলিপিতে ডঃ আহমদ শরীফ লিখে দিয়েছিলেন, ‘আজকের বাংলাদেশে এমনি স্পষ্ট ও অপ্রিয়ভাষী আরও কয়েকজন ছফা যদি আমরা পেতাম, তাহলে শ্রেয়সের পথ স্পষ্ট হয়ে উঠতো।’
আহমদ ছফা যখন মাসিক চারশত টাকা বৃত্তি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ছাত্রাবাসের ২০৬ নং কক্ষে থাকতেন, তখন শামীম সিকদারের সঙ্গে তার আন্তরিক একটা সম্পর্ক তৈরি হয়। ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত ‘অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী’ উপন্যাসে দুরদানা নামে শামীম সিকদারকে এঁকেছেন ছফা।
তাছাড়া নিজের ডায়েরিতে শ্যামা নামের একজন, ‘র’ বর্গীয় নামের একজন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন অধ্যাপক সুরাইয়া খানমের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছেন আহমদ ছফা।
কিন্তু এদের কেউ ছফার জীবনসঙ্গী হতে পারেননি। ছফাকে কেউ বিয়ের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে উত্তর দিতেন, ‘আহমদ ছফাকে ধারণ করার মতো নারী এখনো পাইনি।’
১৯৭৩ সাল থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত ‘দৈনিক গণকণ্ঠ’ পত্রিকার সম্পাদকীয় উপদেষ্টা ছিলেন আহমদ ছফা। তখন তিনি জাসদের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এবং পত্রিকাটিও জাসদের মুখপাত্র হিসেবে পরিচিত ছিলো। ছফা তখন নিয়মিত গণকণ্ঠে লিখতেন, যার বেশিরভাগই ছিলো প্রতিবাদী লেখা। ফররুখ আহমদের জীবদ্দশায় ‘কবি ফররুখ আহমদের কি অপরাধ?’- শিরোনামে একটি লেখা লিখেছিলেন আহমদ ছফা। জাসদের রাজনীতির সাথে জড়িত থাকার কারণে তাকে আন্তর্জাতিক ছাত্রাবাস ছাড়তে হয়েছিল, গবেষণার কাজও বন্ধ করতে হয়েছিল। কিন্তু এতকিছুর পরও জাসদের সাথে জড়িত থাকার সময়গুলোকে তিনি ‘মুগ্ধতার বছর’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। জাসদের সভা – সমাবেশে গরম গরম বক্তব্য দিয়ে মুজিব সরকারের রোষানলে পড়ে আহমদ ছফা দিশেহারা হওয়ার মতো অবস্থা হয়েছিল। তখন জাসদের কাছ থেকে কোনরূপ সহযোগিতা না পাওয়ার কারণে তৎকালীন জাসদের প্রথম সারির তিন নেতা – মেজর এম এ জলিল, সিরাজুল আলম খান ও আ স ম রবের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন আহমদ ছফা।
১৯৭৫ সালের ১০ই আগস্ট কবি সিকান্দার আবু জাফর মারা যান। কবির সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিলো বিধায় শেষবারের মতো কবিকে দেখতে কুমিল্লা থেকে ঢাকায় এসেছিলেন আহমদ ছফা। তখন দেশে বাকশাল কায়েম করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তখন অনেক লেখক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, শিক্ষক, শ্রমজীবী মানুষ ঠেলায় পড়ে হোক বা নিজের গরজে হোক বাকশাল রাজনীতিতে যোগ দিচ্ছিলেন। এই বাকশালনীতির বিরুদ্ধে প্রেসক্লাবে আহমদ ছফা সাংবাদিক নির্মল সেনের নিকট নিজের অবস্থান জানিয়ে দিয়েছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আট – দশজনের মতো শিক্ষকও বাকশালে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। শাসকগোষ্ঠী ধরে নিয়েছিল এর নেপথ্যে আহমদ ছফার হাত রয়েছে।
রটে গেল আহমদ ছফা বাকশালের বিরোধিতা করে বেড়াচ্ছেন সবখানে। খবরটা শেখ মুজিবুর রহমানের বড় ছেলে শেখ কামালের কানেও গেল। শেখ কামালের সিদ্ধান্ত হচ্ছে, ছফাকে শাস্তি দিতে হবে। এরপর পরিচিতজনদের বাসায় গেলে কেউ আহমদ ছফাকে ঘুমাতে দেবে দূরের কথা, বসতেও দিত না। সবার ভেতরেই এক ধরনের চাপা ভীতি কাজ করছিল।
১৯৭৫ সালের ১৪ই আগস্ট সন্ধেবেলা উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটছিলেন আহমদ ছফা। হঠাৎ দেখেন একটা খোলা জিপে সাঙ্গপাঙ্গসহ এগিয়ে আসছে শেখ কামাল। ছফাকে দেখে শেখ কামাল নির্দেশ দিল, ‘হারামজাদাকে ধরে নিয়ে আয়।’
ছফা প্রাণভয়ে নিউ মার্কেটের কাঁচা বাজারের ভেতর ঢুকে পড়েছিলেন এবং শেখ কামালের হাত থেকে রেহাই পেয়েছিলেন।
শেখ মুজিবের শাসনামলে আহমদ ছফা প্রায়সময় নানাভাবে অপদস্থ হয়েছেন। কিন্তু ছফা বলতেন, “বাঙালির শ্রেষ্ঠ কাব্য ‘বলাকা’ নয়, ‘সোনার তরী’ নয়, ‘গীতাঞ্জলি’ নয়; বাঙালির শ্রেষ্ঠ কাব্য ‘আর দাবায়ে রাখতে পারবা না।’
১৪ই আগস্ট রাতে ছফাকে ধাওয়া করলো শেখ কামাল, আর ১৫ই আগস্ট স্বপরিবারে হত্যা করা হল শেখ পরিবারকে। এই ঘটনায় আহমদ ছফার পৈশাচিক আনন্দ হওয়ার কথা, কিন্তু তিনি ব্যথিত হয়েছিলেন। মর্মান্তিক এই হত্যাকাণ্ডের পর সেদিন তথাকথিত কোনো বুদ্ধিজীবীর উচ্চকণ্ঠ শোনা যায়নি, কোনো রাজনীতিক সাহস নিয়ে ঘর থেকে বের হননি। ঢাকা শহরে কোথাও কোথাও মিষ্টি বিতরণ ও ‘নাজাত দিবস’ পালন করা হয়েছিল। অথচ সেই বৈরী পরিবেশে ‘হলিডে’ পত্রিকায় শেখ মুজিব হত্যার প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন আহমদ ছফা।
বিঃদ্রঃ আহমদ ছফা’র গভীরে প্রবেশের জন্য আমাকে ‘আহমদ ছফা রচনাবলী’ ও ‘ছফামৃত’ পুনরায় পাঠ করতে হচ্ছে। তাই কিছুটা দেরিতে হলেও আগামী দুই পর্বে আহমদ ছফা সম্বন্ধে সবাইকে সম্যক একটা ধারণা দেওয়ার ইচ্ছে পোষণ করছি।

About the author

lohagarabd

Leave a Comment