আলোকিত ব্যক্তিত্ব

জনাব ইসলাম খাঁন স্মরণে

Written by lohagarabd
জনাব ইসলাম খাঁন স্মরণেঃ
চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের প্রবীণ মুরব্বী বিশিষ্ট সমাজসেবক, দানবীর, শিক্ষানুরাগী জনাব ইসলাম খাঁন ১৯২২ সালের ১৫ জানুয়ারি সাতকানিয়া উপজেলার রামপুরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মরহুম আব্দুস সোবহান খাঁন এবং মাতা মরহুমা কমর নেগার। মাতামহ জজ ওয়াজী উল্লাহ সামী হলেন চুনতী হাকিমিয়া কামিল(এম.এ) মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা আবদুল হাকীম সাহেবের প্রথম পুত্র। ইসলাম খাঁন সাহেবের বয়স যখন ১ বছর অর্থাৎ ১৯২৩ সালে মরহুম সোবহান খাঁন চুনতীতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। মরহুম ইসলাম খাঁন সাহেবের স্ত্রী মরফুয়া বেগম সাতগড় বুড়া মৌলভী সাহেবের বংশধর এবং মরহুম হাবীব আহমদ পীর সাহেবের খালাতো বোন। মা বাবার ২ পুত্র ও ৩ কন্যার মধ্যে ইসলাম খাঁন সবার বড়। ইসলাম খাঁনের প্রথম বোন শামসুন্নাহার চুনতী নিবাসী মরহুম নুরুল আবছার সাহেবের স্ত্রী ও অ্যাডভোকেট মিনহাজুল আবরার এর মা। দ্বিতীয় বোন মিসবাহ মরহুম বদরুদ্দোজা(আমিন) এর স্ত্রী। তিনি মেজর জেনারেল মিয়া মুহাম্মদ জয়নুল আবেদীন, পিএসসি, বীর বিক্রম এর মেঝ মামী। একমাত্র ছোট ভাই মরহুম মুসলিম খাঁন যিনি একজন সমাজসেবক ছিলেন।
ইসলাম খাঁন সাহেব ছিলেন এলাকার আপামর জনসাধারণের একজন অভিভাবক। তিনি তথাকথিত কোন দানশীল মানুষ ছিলেন না, ছিলেন একজন উদার মনের মানুষ। এলাকার নবীন, প্রবীণ সবার সাথে তিনি মাটির মানুষের মতো মিশে থাকতেন। সবার সাথে তাঁর সুসম্পর্ক ছিল। বর্তমান সময়ে এমন নিখাদ মনের মানুষ বিরল। যিনি শুধু একজন আদর্শ ব্যক্তি নয়, ছিলেন একটি আদর্শ প্রতিষ্ঠান।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম “মানুষ” কবিতায় বলেছেন-
“গাহি সাম্যের গান-
মানুষের চেয়ে কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান,
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি,
সব দেশে, সল কালে, ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।”
জনাব ইসলাম খাঁন যেন কবির কবিতার জীবন্ত উদাহরণ। চুনতির মানুষের সেবা করার জন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেন খাঁন ফাউন্ডেশন। চুনতি ইউনিয়নের সর্বসাধারণ, মসজিদ, মাদ্রাসা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোননা কোনভাবে খাঁন ফাউন্ডেশনের সহযোগিতা পেয়েছে। তিনি ঐতিহ্যবাহী চুনতি হাকিমিয়া কামিল(এম.এ.) মাদ্রাসার গভার্নিং বডির অন্যতম দাতা সদস্য এবং একবার সহ-সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। চুনতি মহিলা সরকারি ডিগ্রী কলেজেরও গভার্নিং বডির অন্যতম দাতা সদস্য ছিলেন তিনি। জীবদ্দশায় চুনতি ইউনিয়নের বাইরেও তিনি অনেক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দান করেছেন।
মরহুম ইসলাম খাঁন চুনতী মাদ্রাসায় পড়ালেখা করেন। তিনি মরহুম আব্দুন নূর সিদ্দিকীর সহপাঠী ছিলেন। বয়স যখন ১৭/১৮ বছর তখন তাঁর মা মৃত্যুবরণ করলে কিছুদিনের মধ্যে বাবার সাথে কলকাতায় চলে যান। সেখানে পৈত্রিক ব্যবসা “খাঁন টি কোম্পানি” তে তিনি জড়িয়ে পড়েন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভক্ত হওয়ার পর তাঁর পিতা দেশে চলে এলে “খাঁন টি কোং” এর নাম বদলিয়ে “ইসলাম খাঁন এন্ড কোং” নামে একক ব্যবসা পরিচালনা করেন। ব্যবসায়িক কাজে পরিবারসহ তিনি দীর্ঘদিন কলকাতায় ছিলেন। কলকাতার প্রসিদ্ধ ব্যবসায়ী হিসেবেও তিনি সুপরিচিত লাভ করেন। ভারতের নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ থাকা সত্বেও তিনি তা নেননি। চুনতির মায়া টানে তিনি স্থায়ীভাবে আবার চুনতি খাঁন মঞ্জিলে বসবাস শুরু করেন। খাঁন সাহেব নিজের সন্তান-সন্ততিদের আলোকিত মানুষ, আদর্শবান এবং উচ্চশিক্ষিত হিসেবে গড়ে তুলেন। কলকাতায় তাঁর সন্তানরা বেড়ে উঠে। এবং সেখানেই পড়াশোনা করে তাঁরা উচ্চশিক্ষিত হন। যাঁরা দেশ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নিজেদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে যাচ্ছেন। খাঁন সাহেব ২ পুত্র এবং ৪ কন্যা সন্তানসন্ততির জনক। বড় ছেলে জনাব আসাদ খাঁন। তিনি প্রাইম লিজিং এর এমডি এবং বাংলাদেশ লিজিং এসোসিয়েশন এর চেয়ারম্যান। ছোট ছেলে জনাব মাসুদ খাঁন। মাসুদ খাঁন বর্তমানে ক্রাউন সিমেন্ট লিমিটেড এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত আছেন। বড় কন্যা মর্জিয়া বেগম মুন্নি, ইংরেজি বিভাগীয় প্রধান, ইডেন কলেজ ও লালমাটিয়া কলেজ। দ্বিতীয় কন্যা মনোয়ারা বেগম কলকাতা প্রবাসী। তৃতীয় কন্যা ডঃ আনোয়ারা বেগম, বাংলাদেশ প্ল্যানিং কমিশনে কর্মরত ছিলেন এবং চতুর্থ কন্যা আফছানা বেগম। পুত্রবধূ মিসেস সুরাইয়া জান্নাত(মাসুদ খানের পত্নী) বিশ্ব ব্যাংকে Lead Financial Management Specialist, Governance Global Practice হিসেবে কর্মরত আছেন। সন্তানদের শত অনুরোধের পরও চুনতির মায়া মমতা ছেড়ে তিনি যাননি। চুনতির গরীব দুঃখী মানুষের দুঃসময়ে তিনি সবসময় হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। লোকমুখে শোনা যায়, তাঁর কাছে কেউ কোনো সাহায্য চেয়ে কখনো খালি হাতে ফিরেনি। খাঁন মঞ্জিলে কত অসহায় মানুষ আসে। কেউ আসে অসুস্থতার জন্য চিকিৎসা সহায়তা চাইতে, অসহায় পিতা মেয়ের বিয়ের সহায়তা চাইতে কেউবা সন্তানদের শিক্ষা সহায়তা চাইতে। তিনি যখন বৃদ্ধ হয়ে গেলেন তখন সন্তানরাই তাঁর দেখানো পথে হাঁটতে শুরু করেন। তাঁরা এলাকার দুঃস্থ মানুষদের চিকিৎসা সেবা দেওয়ার জন্য খাঁন ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রতিবছর এলাকায় চক্ষু শিবির এবং স্বাস্থ্য চিকিৎসা শিবিরের আয়োজন করে থাকেন। এলাকার মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবৃত্তির একটি সুব্যবস্থা করেন। শুধু শিক্ষাবৃত্তি নয় সুবিধাবঞ্চিতদের মাঝে শিক্ষা উপকরণও বিতরণ করে খাঁন ফাউন্ডেশন। তিনি আমৃত্যু চুনতি মাদ্রাসার এতিমখানার ছেলেদের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। পুত্রবধূ মিসেস সুরাইয়া জান্নাতও শ্বশুরের দেখানো পথ অনুসরণ করেন। তিনিও এলাকার মানুষের কাছে একজন দানশীল নারী হিসেবে সুপরিচিত। তিনি চুনতির একমাত্র পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার অন্যতম একজন দাতা সদস্যা। তিনি সুবিধাবঞ্চিত পথশিশুদের স্কুলেরও একজন দাতা সদস্যা। এজন্য ইসলাম খাঁন সাহেবকে নির্দ্বিধায় একজন সফল পিতাও বলা যায়। একটু সময় পেলেই সন্তানেরা প্রিয় গ্রাম চুনতিতে চলে আসেন। এবং চুনতির মানুষদের প্রতি তাদের ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ করেন।
গত ১৪ অক্টোবর, সোমবার খাঁন সাহেব অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে চট্টগ্রাম ম্যাক্স হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। এরমধ্যে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে উনার জন্য এলাকার মানুষের হাহাকারের বার্তা আসতে থাকে এবং বিভিন্ন মহল থেকে উনার সুস্থতার জন্য দোয়া চাওয়া হয়। ১৫ অক্টোবর, মঙ্গলবার তিনি চুনতীর মানুষকে অভিভাবক হারা করে না ফেরার দেশে চলে গেলেন।(ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন)। এরপর তাকে নিজগ্রাম চুনতীতে নিয়ে আসা হয়। ১৬ অক্টোবর, বুধবার চুনতী হাকিমিয়া কামিল(এম.এ) মাদ্রাসা মাঠ প্রাঙ্গণে বাদে আছর তাঁর জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর পারিবারিক কবরস্থানে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। চুনতিতে কালে কালে বহু জ্ঞানী, গুণী, সূর্যসন্তান জন্ম নিয়েছেন। কিন্তু এলাকার জন্য তাদের অবদান এতটা ছিল না বলে তারা অনেকেই এখন মানুষের কাছে অজানা। ইসলাম খাঁন সেই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের মধ্যে একজন। সর্বোপরি নিঃসন্দেহে তিনি চুনতী তথা লোহাগাড়ার জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। লোহাগাড়ায় দেশের নামকরা বেশ কয়েকজন শিল্পপতির জন্ম। এই এলাকায় জন্ম নেওয়া সূর্যসন্তানরা রাষ্ট্রের সরকারী, বেসরকারি বিভিন্ন পর্যায়ের উচ্চপদে নিযুক্ত আছেন। কিন্তু তাঁরা কয়জনই বা এলাকার মানুষদের কথা ভাবেন। তাঁরা ক’জনই বা এলাকায় আসেন। বছরের উৎসবগুলোতেও তাদের অনেকেই গ্রামে আসেন না। মাটি ও মানুষের জন্য খাঁন সাহেব ভালবাসার এমন দৃষ্টান্ত গড়েছেন বলেই আজ তিনি পরপারে চলে গিয়েও সবার মাঝে বেঁচে আছেন। খাঁন সাহেবের জীবনী থেকে সবাইকে শিক্ষা গ্রহণ করা উচিৎ। মানুষ মাত্রই মরণশীল। কিন্তু মানুষের মত মানুষ হতে না পারলে মনুষ্য আর অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে পার্থক্য কিসে? মরহুম ইসলাম খাঁন সাহেব যেভাবে মানুষের সাথে মিশে ছিলেন ঠিক একইভাবে যেন তাঁর সাজানো খাঁন পরিবার সবার সাথে মিশে থাকে এই প্রার্থনা করি। খাঁন পরিবারের সকলের সুস্বাস্থ্য এবং দীর্ঘায়ু কামনা করছি।(আমীন) এবং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যেন মরহুম ইসলাম খাঁনের সমস্ত দান কবুল করেন এবং মহান আল্লাহ যেন তাকে জান্নাত দান করেন।(আমীন)

About the author

lohagarabd

Leave a Comment