বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যাঃ ১ম পর্ব

Written by lohagarabd
১.
দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ব্রিটিশ ভারতকে বিভক্ত করে দুটি সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠিত হয়। দুটি রাষ্ট্রের নামকরণ করা হয় ভারত অঙ্গরাজ্য এবং অপরটি পাকিস্তান অঙ্গরাজ্য। অবিভক্ত ব্রিটিশ ভারতের একটি অঞ্চলের নাম পূর্ব বাংলা। বিভক্ত হওয়ার পর এই অংশ পাকিস্তানের পূর্বে অবস্থান করার জন্য এবং এটি নবগঠিত সার্বভৌম দেশ পাকিস্তানের অংশ হওয়াতে এর নাম পরিবর্তন করে “পূর্ব পাকিস্তান” নামকরণ করা হয়। যদিও এই পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তানের মাঝে বিস্তর ভৌগলিক দূরত্ব ছিলো। এই দুই অঞ্চলের মধ্যে প্রায় ১৩০০ মাইল ভৌগোলিক দূরত্ব ছিলো। এই দুই অঞ্চলের মধ্যে যে শুধু ভৌগলিক দূরত্ব ছিলো তা না; এখানে সাংস্কৃতিক, ভৌগলিক, ভাষাগত পার্থক্য ছিলো। দ্বিজাতিতত্ত্ব ভিত্তিতে রাষ্ট্র বিভক্তিটাই পুরো প্রশ্নবিদ্ধ ছিলো। শিল্প কারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, ফসল উৎপাদন অর্থাৎ অর্থনৈতিক দিক থেকে পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তান থেকে পিছিয়ে ছিলো। জনসংখ্যার দিক থেকেও পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ পূর্ব বাংলা এগিয়ে ছিলো। তবুও শুরু থেকেই পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিমা শাসক ও সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিলো।

২.

বাঙালী জাতীকে বঞ্চিত করার জন্য, দমিয়ে রাখার জন্য ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতা সেনাবাহিনীর হাতে ন্যাস্ত হয়। যদিও শুরু থেকেই পাকিস্তানের শাসনকার্যে সামরিক জান্তাদের হস্তক্ষেপ ছিলো। পাকিস্তানের জেনারেলরা সবসময় বাঙালি জাতিকে নিচু জাতের, নিচু শ্রেণির মনে করতো। তারা সবসময় নিজেদের ইচ্ছাকে বাঙালীর ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতো৷ প্রায় সমস্ত নাগরিক সুবিধা থেকে বাঙালীদের বঞ্চিত করা হয়েছিলো। এমনকি মায়ের ভাষা পর্যন্ত কেড়ে নেওয়ার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলো। বাঙালী জাতী তা মেনে নিতে পারেনি। মায়ের ভাষা কেড়ে নেওয়ার মতো এতো নিকৃষ্ট আচরণ পৃথিবীতে আর কোথাও ঘটেনি। ভাষা ছাড়া মানুষ মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে না। আর এই ভাষায় নাকি নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার চেষ্টা পাকিস্তানি শাসকরা করেছিল। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত-পাকিস্তান বিভক্ত হওয়ার পর থেকে পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মানুষদের মধ্যে রাষ্ট্রভাষা নিয়ে দ্বিমত হয়। পাকিস্তানের শাসকরা বারবার বলে আসছিলো উর্দু হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। কিন্তু এটা কোন যুক্তিতেই হওয়ার কথা না। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ভাষা বাংলা। তাহলে কেন রাষ্ট্রভাষা উর্দু হবে? কিন্তু
পাকিস্তানি সামরিক শাসক কর্তৃক এই ভাষা ইস্যু নিয়ে একেবারে ছাড় দেওয়া হয়নি। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ এটা মেনে নিতে মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলো না। ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে সাধারণ ধর্মঘট আহ্বানকালে বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হন। ১৫ মার্চ তিনি মুক্তি পান। ১৯৪৯ সালে ফরিদপুরে কর্ডন প্রথার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার জন্য আবারো গ্রেফতার হন। ঐ বছর ১৫ জানুয়ারি তিনি আবারো কারগার থেকে মুক্তি পান। ১৯৪৯ সালে যখন বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা তাদের দাবী দাওয়া আদায়ের উদ্দেশ্যে ধর্মঘট করলে বঙ্গবন্ধু তার প্রতি আহ্বান জানান। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার অভিযোগে তাকে জরিমানা করা হয়। এবং তাকে এই অভিযোগে গ্রেফতার পর্যন্ত করা হয়। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হলে বঙ্গবন্ধু জেলে থাকা অবস্থায় যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। ঐ বছর ২৭ জুলাই তিনি জেল থেকে মুক্তি পেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে না গিয়ে বঙ্গবন্ধু জাতীয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। কোথায় একটি নতুন রাষ্ট্রে মানুষ সুখে শান্তিতে বসবাস করবে তা না। বরং নতুন শাসকরা ভাষা নিয়ে টানাটানি করবে? এভাবে বাঙালির মনে আন্দোলনের বীজ বপন হতে থাকে। ফলে পূর্ব বাংলার মানুষ বাংলাভাষার সম-মর্যাদার দাবীতে আন্দোলন করতে রাজপথে নেমে পড়ে। এসব আন্দোলন দমনে সভা, সমাবেশ, মিছিল, মিটিং বেআইনীও নিষিদ্ধ ঘোষণা করে পুলিশ ১৪৪ ধারা জারী করে। এভাবে ভাষার তর্ক বিতর্ক চলতে চলতে ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনকে ঘিরে দুই পক্ষের মধ্যে প্রথম সংঘাতের সূত্রপাত হয়। ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী এবং প্রগতিশীল কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে। মিছিলটি ঢাকা মেডিকেল কলেজের কাছে পৌঁছালে পুলিশ ১৪৪ ধারা ভঙ্গের অজুহাতে আন্দোলনরত মানুষের ওপর গুলিবর্ষণ করে। এতে শহীদ হন রফিক, সালাম, বরকত, আব্দুল জব্বার সহ আরো অনেকেই। গুরুতর আহত হন প্রায় ১৭ জন ছাত্র যুবক। ঢাকার রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হয়। বিশ্বের ইতিহাসে এটিই একমাত্র নজিরবিহীন আন্দোলন, যে আন্দোলনে ভাষার জন্য মানুষ জীজন উৎসর্গ করেছিলো। পরেরদিন ২২ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা চট্টগ্রামসহ সারা দেশের ছাত্র, শ্রমিক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক ও সাধারণ জনতা পূর্ণ হরতাল পালন করে, পূর্ব পাকিস্তানের স্কুল সমূহ বন্ধ রাখা হয় এবং সভা-শোভাযাত্রা করা হয়। এই দুইদিনেও পুলিশ গুলি চালায়৷ নিহত হন আরো অনেকেই। অবশেষে ক্রমবর্ধমান আন্দোলনের চাপের মুখে পড়ে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার ১৯৫৪ সালের ৭ মে মুসলিম লীগের সমর্থনে বাংলাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা দিতে বাধ্য হন। বাংলাকে পাকিস্তানের দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে সংবিধানে পরিবর্তন আনা হয় ১৯৫৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি।

About the author

lohagarabd

Leave a Comment