বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যাঃ ২য় পর্ব

Written by lohagarabd
৩.
যদিও তারা এটি মন থেকে মেনে নিতে পারেনি। তাই নতুন করে তারা বাঙালীদের সুবিধা বঞ্চিত করার নীলনকশা আঁকতে থাকে। এভাবে পরবর্তী ১০ বছর অর্থাৎ এক দশক ধরে পাকিস্তানি শাসকরা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষদের শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক এমনকি সরকারী চাকুরী দেওয়ার ক্ষেত্রেও বৈষম্য করতে থাকে। পূর্ব পাকিস্তানে উন্নয়নকাজ কমিয়ে দেয়। শিল্প প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমতে থাকে। পাকিস্তানী শাসকদের স্বৈরাচারী বিরোধী আন্দোলন শুরু হয় ১৯৫০ এর মাঝামাঝি সময়ে। এক দশক ধরে বাঙালীদের মাঝে জাতীয়তাবাদ ধারণাটি বিস্তার লাভ করতে থাকে। পাকিস্তানি শাসকদের এই অযৌক্তিক প্রভাব এবং অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে বাঙালিদের নেতৃত্বদানের লক্ষ্যে প্রথম পদক্ষেপ ছিলো মাওলানা ভাসানীর আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা। ১৯৪৯ সালে এই রাজনৈতিক দলের সূচনা। ১৯৫৩ সালের ১৬ নভেম্বর প্রাদেশিক আওয়ামী মুসলীম লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মনে তখন একটুখানি আশার প্রদীপ জ্বলেছিল। মুসলিম লীগসহ পাকিস্তানের কয়েকটি দল মিলে ১৯৫৪ এর নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে নির্বাচনে অংশ নেন। এই যুক্তফ্রন্টের তিন জন বাঙালি প্রধান নেতা ছিলেন মাওলানা ভাসানী, শেরে বাংলা একে ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। এই নির্বাচনে বিপুল ভোটে মুসলিম লীগ এবং যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করে৷ বঙ্গবন্ধু বিপুল ভোটে গোপালগঞ্জ থেকে বিজয়ী হন। বঙ্গবন্ধু যুক্তফ্রন্টের বয়ঃকনিষ্ঠ মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। কিন্তু বাঙালী নেতাদের মুখে হাসি পাকিস্তানের শাসকরা মেনে নিতে পারেনি। যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রীসভা গঠন করলেও তা স্থায়ী হয়নি। তাঁদের অঙ্কিত নীলনকশার পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় সরকার নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকারকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে এবং গভর্নর শাসন ব্যবস্থা চালু করে। বাঙালীদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার জন্য অনেক টালবাহানা করতে থাকে। বঙ্গবন্ধু ৩০ মে করাচী থেকে ঢাকায় ফিরেন। এবং তিনি গ্রেফতার হন। ১৯৫৪ সালের ২৩ নভেম্বর তিনি মুক্তি পান এবং জেল গেট থেকে নিরাপত্তা আইনে তাকে আবারো গ্রেফতার করা হয়৷ ঐ বছর আবার তিনি মুক্তি পান। ১৯৫৫ সালে বঙ্গবন্ধু গণপরিষদের সদস্য নির্বাচন হন। বঙ্গবন্ধু পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবী করেন। ধর্ম নিরপেক্ষতার আদর্শে দল থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ নামকরণ করা হয় এবং বঙ্গবন্ধু সাধারন সম্পাদক নির্বাচিত হন। রাষ্ট্র পরিচালনার নামে ১৯৫৬ সালে আইনের বিধানে মূলনীতির পরিপন্থি সংবিধান রচনা করেছিলো তারা৷ পাকিস্তানকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং প্রজাতন্ত্রের সকল কর্মকান্ড সর্বশক্তিমান আল্লাহর বিধান অনুযায়ী পরিচালিত হওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত হয়। যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার ব্যবস্থা চালু করা হয়। এসব টালবাহানার ফলে রাষ্ট্রে রাজনীতির মাঠে আরো অস্থিরতা বিরাজমান করে। যার ফলে ১৯৫৬ সালের সংবিধানের প্রয়োগ পুরোপুরি ব্যর্থ সংবিধান হিসেবে পর্যবেশিত হয়। এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর দেশে সামরিক শাসন জারি করে। সামরিক শাসন চালুর তিন সপ্তাহের মাথায় জেনারেল ইয়াহিয়া ইস্কান্দার মির্জাকে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে জেনারেল আইয়ুব খান নিজেই রাষ্ট্রপতি হন। ১৯৫৮ সালের ১২ অক্টোবর বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর বঙ্গবন্ধুকে আরো কয়েকবার গ্রেফতার করা হয় এবং জামিনও দেওয়া হয়৷। আইয়ুব খান ১৯৫৬ সালের সংবিধান বাতিল করেন এবং কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইনসভা ও মন্ত্রীসভা ভেঙে দেন। সকল রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করেন তিনি। যদিও ১৯৫৮ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত দেশে একনায়কতন্ত্র শাসন বিদ্যমান ছিল। আইয়ুব খান ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য গণতন্ত্রের নামে “মৌলিক গণতন্ত্র” ব্যবস্থা চালু করেন। এ পদ্ধতিতে নির্বাচন হলে ৮০ হাজার মৌলিক গণতন্ত্রী নির্বাচন করেন। এভাবে তিনি আস্তা অর্জন করে ১৯৬২ সালে তিনি আবারো সংবিধান পরিবর্তন করেন। তবে এই সংবিধানের অনেক নীতি ৫৬ এর সংবিধানের অনুরূপ। ৬২ এর সংবিধান অনুযায়ী পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান দুটি প্রদেশে বিভাজন করা হয়। পাকিস্তান দুটি প্রদেশে বিভক্ত একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। কেন্দ্র ও প্রদেশসমূহের মধ্যে ক্ষমতা ভাগ করা হয়েছিল। কিন্তু জেনারেল আইয়ুব খানের এই সংবিধানও দুই প্রদেশের মানুষের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বিভিন্ন মহল থেকে তীব্র প্রতিবাদও হয় এবং এই প্রতিবাদ গণআন্দোলনে রূপ নেয়। গণআন্দোলনের মুখে আইয়ুব সরকার ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বাধ্য হন। আর্মি প্রধান জেনারের ইয়াহিয়ার নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। পাকিস্তানে যখনি নির্বাচন হয়েছে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক ব্যক্তিরা জনগণের বিপুল ভোটে জয়লাভ করার পরও তাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় প্রতিবারই নানা অজুহাতে টালবাহানা করে একের পর একে জেনারেলরা সামরিক শাসনের নামে ক্ষমতা দখল করে নেয়। জেনারেল ইয়াহিয়া খান ১৯৬২ সালের সংবিধান বাতিল করেন। এদিকে এসব নীল নকশার বেড়াজালে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের আর্তসামাজিক অবনতি দিনদিন বেড়েই চলছিলো। তাই বাঙালী জাতীর মুক্তির জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলীয় রাজনৈতিক দলসমূহের এক সম্মেলনে আওয়ামী লীগের হয়ে ৬ দফা দাবি উত্থাপন করেন। এটিকে বাঙালী জাতীর মুক্তির সনদ বা ম্যাগনাকার্টাও বলা হয়। ছয় দফা দাবি উত্থাপনের ফলে বঙ্গবন্ধু আইয়ুব খানের অন্যতম বিরোধী পক্ষে পরিণত হন। ৬ দফা আন্দোলনের জন্য বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হন। তবে বঙ্গবন্ধু নির্দোষ, নিরপরাধ প্রমাণিত হয়ে জেল থেকে মুক্তি পান। ৩ মাসে তিনি ৮ বার গ্রেফতার হন। শেষ বার তাকে গ্রেফতার করে নির্জন কারাবাসে রাখা হয়। ১৯৬৮ ৩ জানুয়ারী পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে এক নম্বর আসামী করে মোট ৩৫ জন বাঙ্গালী সেনা ও সিএসপি অফিসারের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে বিছিন্ন করার অভিযোগে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে। ১৯৬৮ সালের ২৮ জানুয়ারী নিজেকে নির্দোষ দাবী করে আদালতে লিখিত বিবৃতি দেন। এই বিবৃতি পড়ে বঙ্গবন্ধুর মুক্তি ও তার মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবীতে আন্দালন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ছাত্র সমাজ ছয় দফার সমর্থনে ১১ দফা দাবী উপস্থাপন করে। এই পরিস্থিতি ঠেকাতে আলোচনার জন্য বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তাদের সেই প্রস্তাব ঘৃণার সাথে প্রত্যাখান করেন। ১৯৬৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের অভ্যন্তরে নির্মমভাবে হত্যা করে। যার ফলে বিক্ষুব্ধ জনতা এই হত্যার প্রতিবাদে রাজপথে নেমে আসে। এর ফলস্রুতিতে মিথ্যা মামলাটি প্রত্যাহার করে। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারী ডাকসু এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবকে এক বিশাল সংবর্ধনা দেয়ার আয়োজন করে। ঐ সভায় শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ১৯৬৯ সালের ১০ মার্চ পাকিস্তানে বিরাজমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে আইয়ুব খান সরকার গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করেন। গোল টেবিলে ৬ দফার পক্ষে বঙ্গবন্ধু দৃঢ় অবস্থান নেন। তাই ঐ বৈঠক ব্যর্থ হয়। বাঙালীর জাতীর এই অবিসংবাদিত নেতা দেশ বিভক্তের শুরু থেকেই একজন প্রতিবাদী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ভূমিকা পালন করেন। দেশ ভাগের দীর্ঘ ২৩ বছরে বাঙালী জাতী কখনো আত্মমর্যাদায় আসীন হতে পারেনি। পাকিস্তানি অযোগ্য শাসকদের হাতে বারবার পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ শোষিত হয়েছে। পায়নি সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সুবিধা। এই অঞ্চলের রাজনৈতিক দলগুলো নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে জয়লাভ করেও কখনো ক্ষমতায় বসতে পারেনি। এই দীর্ঘ সময় বঙ্গবন্ধু পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের পাশে ছিলেন। ১৯৬৯ সালের ২৮ নভেম্বর জাতির উদ্দেশ্যে এক বেতার ভাষণে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ১৯৭০ এর ১ জানুয়ারী থেকে রাজনৈতিক কর্মকান্ডের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষনা দেন। ঐ বছরের শেষ ভাগে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথাও ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধু প্রথমেই ৬ দফার পক্ষে দেশব্যাপী ব্যাপক প্রচারণা শুরু করেন। আওয়ামী লীগ এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রাদেশিক ও জাতীয় নির্বাচনের আলাদা আলাদা তারিখ ঘোষণা করেন ইয়াহিয়া খান। ১৯টি রাজনৈতিক দলের প্রতীক বরাদ্দ করা হয়। আওয়ামী লীগ পায় নৌকা প্রতীক। ১৯৭০ সালের ২৮ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু বেতার ও টেলিভিশনে নির্বাচনী ভাষণ দেন। তিনি বলে, ‘প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে দিয়েই আওয়ামী লীগের জন্ম। তার সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যে দিয়েই আওয়ামী লীগের বিকাশ’ । তিনি দেশবাসীর কাছে ছয় দফার পক্ষে সমর্থন চান। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর হঠাৎ পূর্ব বাংলায় নেমে আসে ভয়াবহ ঝড় এবং জলোচ্ছাস। এই প্রাকৃতিক দূর্যোগে প্রায় ১০-১২ লাখ মানুষ মারা যান। বঙ্গবন্ধু ছিলেন উদার মানবতাবাদী। তিনি নির্বাচনী প্রচারণা স্থগিত করে ত্রাণ কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি এই অঞ্চলের জনগনের প্রতি চরম উদাসীনতা তুলে ধরেন। ঘোষণা অনুযায়ী ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর বন্যা-দুর্গত এলাকা বাদে জাতীয় পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে জাতীয় পরিষদে আওয়ামী লীগ ১৬৭টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন করে। পাকিস্তান পিপলস পার্টি পায় ৮৮টি আসন। এবং ১৯৭০ সালের ১৭ ডিসেম্বর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তান ২৯৮টি আসন লাভ করে। ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা ভিত্তিতে আওয়ামিলীগ এর নির্বাচিত প্রার্থীরা ৬ দফা বাস্তবায়নের জন্য শপথ গ্রহণ করেন। শপথ অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথের “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি” সংগীতের মধ্য দিয়ে শপথ অনুষ্ঠানের উদ্বোধন হয়। অনুষ্ঠানে জয় বাংলা বাংলার জয় গানটি পরিবেশন হয়৷ এবং বঙ্গবন্ধু জয় বাংলা ধ্বনিতে বাংলা এবং বাংলার মানুষদের মুক্তির সংকল্প ব্যক্ত করেন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ১০ জানুয়ারী ঢাকায় এসে তিন দফায় বঙ্গবন্ধুর সাথে বৈঠক করেন। তিনি বঙ্গবন্ধুকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আশ্বাস দেন। এদিকে পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো এই বিশাল পরাজন মানতে পারেননি। তিনি ইয়াহিয়া খানের সাথে আবার ক্ষমতা দখলের টালবাহানা শুরু করেন। ২৭ জানুয়ারী ভুট্টো ঢাকায় আসেন বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করতে। কিন্তু এই আলোচনায় ভুট্টো ব্যর্থ হন। ইয়াহিয়া খান সরকারি এক ঘোষণায় বলেন ৩রা মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন হবে। ১লা মার্চ জাতীয় পরিষদকে সামনে রেখে আওয়ামীলীগ সংসদীয় দল একটি সমাবেশ করে। ঐ দিনই হঠাৎ কোন কারণ ছাড়া ইয়াহিয়া খান অনির্ধিষ্টকালের জন্য জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত করে দেন। ঐ দিনই বাংলার মানুষ ক্ষোভে বিক্ষোভ করে। তারা রাজপথে নেমে সোচ্চার কণ্ঠে আওয়াজ তোলেন। বঙ্গবন্ধুর আর বুঝতে বাকি রইলো না এটি পাকিস্তানি শাসকদের নতুন চক্রান্ত। তাই তিনি ২রা এবং ৩রা মার্চ পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধুর ডাকে বাংলার মানুষ সাড়া দেন। ঢাকায় স্বতস্ফূর্তভাবে হরতাল পালন হয়। সামরিক জান্তারা বিক্ষুব্ধ জনতাকে দমিয়ে রাখার জন্য কারফিউ জারি করে। ৩রা মার্চ বাংলার মানুষ কারফিউ উপেক্ষা করে রাজপথে নেমে আসে। দীর্ঘদিন ধরে নিরীহ আর শোষিত এই বিক্ষুব্ধ জনতার ওপর গুলি চালানো হয়। গুলিবিদ্ধ অনেকেই নিহত হন। বাঙালীদের এবার মনে হয় রুখে দাঁড়ানোর সময় হয়েছে। বঙ্গবন্ধু বাংলার মানুষদের মুক্ত করার জন্য ৭ই মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে(বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক যুগান্তকারী ভাষণে স্বাধীনতার ডাক দেন। তিনি সেদিন বজ্রকণ্ঠে আওয়াজ তুলে বলেন, “এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম।” বঙ্গবন্ধু এই ভাষণে স্বাধীনতার ভবিষ্যৎ অনেকটা স্পষ্ট হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলন চলতে থাকে। বাংলা ভাষা কথা বলা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষদের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগ্রত হয়েছিল। এটা পাকিস্তানি সামরিক জান্তা, পিপলস পার্টির নেতা ভুট্টো এটা বুঝতে পেরেছিল। উল্লেখ্য যে, জেনারেল আমীর আবদুল্লাহ খান নিয়াজী তার রচিত ‘দ্য বিট্রেয়াল অভ ইস্ট পাকিস্তান’ বইতে লিখেছে “তদানীন্তন ইয়াহিয়া সরকার জুলফিকার আলী ভুট্টোর পরামর্শে পরিকল্পিতভাবে ১৯৭১ সালে র্পূব পাকিস্তান পরিত্যাগ করে। ভুট্টোকে পাকিস্তানের একচ্ছত্র নেতা বানানোর জন্য তারই ষড়যন্ত্রে ইয়াহিয়া পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ওপর অস্ত্র প্রয়োগ করে। ভুট্টো চেয়েছে ক্ষমতা; এতে পাকিস্তান টিকুক আর না টিকুক।” যার ইঙ্গিত খোদ ভুট্টোরই এক ভাষণে পাওয়া যায়, ওই ভাষণে বঙ্গবন্ধুকে লক্ষ্য করে ভুট্টো বলেছিল, ‘এধার হাম, ওধার তুম’।
৪.
পূর্ব পাকিস্তানের মানুষরা যখন ক্ষোভে উত্তাল তখন সামরিক জান্তাটা বাঙলিদের ওপর নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালানোর জন্য পূর্ব প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। এই হত্যাযজ্ঞ চালানোর পরিপ্রেক্ষিতে বেলুচিস্তানের কসাই নামে খ্যাত জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে প্রেরণ করেন। কিন্তু বাঙালী বিচারপতি তাকে গভর্নর হিসেবে শপথ পাঠ করাতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপব করেন। এদিকে জেনারেল ইয়াহিয়া সুকৌশলে বঙ্গবন্ধুর সাথে আলোচনার নামে নাটক করতে থাকে। আর এই নাটকের মধ্যদিয়ে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানে সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্র প্রেরণ করতে থাকে। ২৩ মার্চ বাংলাদেশের প্রতিটি যানবাহনে লাল-সবুজের পতাকা উত্তোলিত হয়। সকালে বাংলাদেশের বেসরকারী প্রশাসনের সদর দপ্তর অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির ৩২ নং সড়কের বাসভবনে পতাকা উত্তোলিত হয়। এই দিনটি পাকিস্তানের একটি বিশেষ দিন, পাকিস্তান দিবস। তা সত্বেও পূর্ব পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টভবন, ক্যান্টনমেন্টগুলো এবং তেজগাঁ বিমানবন্দর ছাড়া কোথায়ও চাঁদতারা খচিত পতাকা উত্তোলন করা হয়নি। সর্বত্র লাল-সবুজের বুকে মানচিত্র খচিত পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিলো। যেখানে চাঁদতারা পতাকা উত্তোলন করস হয়েছিল তা অবিলম্বে নামিয়ে লাল-সবুজের পতাকা উত্তোলন হয়েছিলো। বঙ্গবন্ধু অবশ্য এই দিনকে বন্ধ ঘোষণা করেন। ২৫শে মার্চ বিশ্বের ইতিহাসে এক নৃশংস কালো রাত্রি ছিলো। এটি বাঙালী জাতীর জীবনে বয়ে আনে কান্না। এই রাতেই পাকিস্তানি সামরিক জান্তাদের দীর্ঘ পরিকল্পনার হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। রাত সাড়ে এগারোটার দিকে শুরু হয়ে যায় এই হত্যাকাণ্ড। এটির নাম দেওয়া হয়েছিলো “অপারেশন সার্চলাইট। ঐ রাতেই অর্থাৎ ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরেই ১২ঃ৩০ মিমিটের দিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক গ্রেপ্তার হওয়ার আগেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র চট্টগ্রামের জহুরুল আহমেদ চৌধুরীর নিকট ওয়ারলেস যোগে প্রেরণ করা হয়। পরবর্তীতে ২৭ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় বাঙালীর গৌরবময় এই সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রাম।

About the author

lohagarabd

Leave a Comment