বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যাঃ ৩য় পর্ব

Written by lohagarabd
গণহত্যাঃ
গণহত্যা এর ইংরেজি প্রতিশব্দ Genocide. জেনোসাইড শব্দটি একটি সংকর জাতীয় শব্দ। এটি গ্রীক শব্দ Genos এবং ল্যাটিন শব্দ Cide এর সমন্বয়ে গঠিত। Genos অর্থ জাতি বা মানুষ আর Cide অর্থ হত্যাকাণ্ড।
বাংলা শব্দ গণহত্যা এবং এর ইংরেজি প্রতিশব্দ জেনোসাইড একই উৎস থেকে আগত। গণ এর অর্থ গোষ্ঠী এবং হত্যা এর অর্থ সংহার। অর্থাৎ গণহত্যা কোনো গোষ্ঠীভুক্ত মানুষজনকে নির্মূল করা বা মেরে ফেলাকে বুঝায়।
.
৯ ডিসেম্বর, ১৯৪৮ সনের জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত রেজ্যুলেশন ২৬০ (৩) এর অধীনে গণহত্যাকে এমন একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় যা প্রতিরোধে পৃথিবীর সকল রাষ্ট্র অঙ্গীকারবদ্ধ।
.
জাতিসংঘের গণহত্যার অপরাধ প্রতিরোধ ও শাস্তি সম্পর্কিত কনভেনশনের ২৬০(৩) এর অনুচ্ছেদ-২ অনুযায়ী,
গণহত্যা মানে জাতীয় বা জাতিগত, জাতিগত বা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণরূপে বা কিছু অংশ ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে হত্যা করা, নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে তাদেরকে গুরুতর শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি করা, পরিকল্পিতভাবে তাদের ধ্বংসসাধনকল্পে এমন জীবননাশী অবস্থা সৃষ্টি করা যাতে তারা সম্পূর্ণ অথবা আংশিক নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, তাদের মধ্যে জন্মরোধ করার লক্ষ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করা, শিশুদের অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে তাদের জন্মপরিচয় ও জাতিগত পরিচয়কে মুছে ফেলাকেও গণহত্যা বলা হয়।
.
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল গোয়েন্দা সংস্থা ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন(এফবিআই) এর মতে গণহত্যা হলো সেই হত্যাকাণ্ড যখন কোন একটা ঘটনায় চার বা তার অধিক সংখ্যক মানুষ মারা যায় এবং হত্যাকাণ্ডের মাঝে কোন বিরতি থাকে না। গণহত্যা সাধারণত একটি নির্দিষ্ট স্থানে ঘটে, যেখানে এক বা একাধিক মানুষ অন্যদের মেরে ফেলে।
.
মহান মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যাঃ
রাজধানী ঢাকায় ২৫ মার্চ রাতে নিরীহ-নিরস্ত্র, অসহায় ঘুমন্ত বাঙালির ওপর চালানো হয় পরিকল্পিত এই ভয়াল হত্যাকাণ্ড। ভারী মেশিনগান, মর্টারট্যাঙ্ক দিয়ে অতর্কিত এই আক্রমণে মাত্র এক রাতেই লাখ লাখ মানুষ হত্যা করা হয়। এই রাতেই জেনারেল ইয়াহিয়ার সেনা বাহিনী, এবং এই দেশীয় দোসররা আওয়ামীলীগ নেতাদের পাশাপাশি, ডাক্তার, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, ছাত্র, প্রকৌশলী, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশা শ্রেণির মানুষের বাড়িতে হানা দেয়। তাদের এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের মধ্যদিয়ে সূচনা করে মাসব্যাপী গণহত্যা, অত্যাচার, নিপীড়ন, নারী ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট। দীর্ঘ নয়মাস ধরে চলতে থাকে অবিরত এই গণহত্যা। ১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী যে হত্যাযজ্ঞ বাংলাদেশের মানুষের ওপর চালিয়েছিলো এটি বিশ্বব্যাপী একটি অন্যতম গণহত্যা নামে পরিচিত। মহান মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে নিরস্ত্র বাঙালি জাতির ওপর পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী যে হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিলো এটি তৎকালে বিভিন্ন রাষ্ট্র থেকে আগত গণমাধ্যম কর্মী, প্রতিনিধিদের মতেও একটি গণহত্যা ছিলো। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানি দোসর ও হানাদার বাহিনী কতজন মানুষকে হত্যা করেছিলো তার সঠিক জরিপ করা হয়নি। তবে ইতিহাসের এই কালো অধ্যায়ের একটি হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৩০ লক্ষ নিরীহ বাঙালী হত্যা হয়েছিলো বলে ধরা হয়৷ পৃথিবীতে সংঘটিত বিভিন্ন যুদ্ধের ইতিহাসে এমন নির্মম ঘটনা আর ঘটেনি। জাতিগত নির্মূলের লক্ষ্যে পৃথিবীতে ঘটে যাওয়া অন্যান্য হত্যাকাণ্ডের মতো এটিও একটি হত্যাকাণ্ড। যুগে যুগে পৃথিবীর ইতিহাসে ঘটে যাওয়া গণহত্যার দিকে তাকালে একটি বিষয় পরিলক্ষিত গণহত্যা কখনো জাতীগত নির্মূলের জন্য কখনো কখনো আদর্শগত কিংবা গোষ্ঠীগত বিদ্বেষের ফলে আবার কখনো রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে গণহত্যার সূত্রপাত হয়। এসব পরিস্থিতি সৃষ্টির কারণে হুমকির মুখে পড়েও গণহত্যা সংঘটিত করে। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকরা বুঝতে পেরেছিলো যে বাঙালিদের এতো সহজে বুঝানো সম্ভব না। তাই ইতিহাসের পাতায় রচিত অন্যান্য গণহত্যার পেছনে যে বুদ্ধিহীনতার পরিচয় হত্যাকারীরা দিয়েছেন সেই ভুলটি পাকিস্তানি শাসকরা করেনি। তারা ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পিতভাবে ১৯৭১ সালে দীর্ঘ নয়মাস ধরে বাঙালি হত্যা করে। শুধুমাত্র হত্যা করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি তারা মা-বোনদের সম্ভ্রমহানি করেছিলো।পাকিস্তানের সেনা সদস্যদ্বারা মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রায় দুই লাখের মতো নারী ধর্ষিত হয় বলে ধারণা করা হয়। পিতৃ পরিচয়হীন কত সন্তান জন্ম নিয়েছেন তার কোন নির্দিষ্ট সংখ্যা জানা নেই। তবে এই সংখ্যাও কম না। যুদ্ধে এসব পটিচয়হীন জন্ম নেওয়া শিশুদের নাম দেওশা হয় যুদ্ধশিশু। অনেক নারী সমাজে প্রশ্নবিদ্ধ হবে এজন্য সন্তান ফেলে অন্যত্র চলে যান। সমাজের ভয়ে সাহস করে এসব নির্যাতিত নারীরা নিজেকে বীরাঙ্গনা পরিচয় দিতেও লজ্জাবোধ করতো। কিন্তু শিশুদের অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে তাদের জন্মপরিচয় ও জাতিগত পরিচয়কে মুছে ফেলাকেও গণহত্যা।

About the author

lohagarabd

Leave a Comment