গল্প

পরীকন্যা জেবাঃ মিজান উদ্দীন খান বাবু

Written by lohagarabd
সেই কাকডাকা ভোর থেকেই কেন জানি বারবারই মনে হচ্ছিল আজ কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।
কিন্তু কি হতে পারে ?
যাক, ফালতু শংকা ভাবনা করার মতো পর্যাপ্ত সময় কিন্তু আমার মোটেই নেই।
জ্বী, আমি খেঁটে খাওয়া অতি সাধারণ একজন মানুষ।পেশার কথা না হয় বিস্তারিত না-ই বললাম।
কলতলা থেকে সবে স্নান সেরে বিছানায় এসে বসেছি, এখনো গায়ে কাধেঁ সেই ভিজে জল গামছা। কিন্তু হটাত আমাতে যেন রাজ্যের আলস্য এসে ভর করলো।
উঠে দাঁড়াতেই ইচ্ছে করছেনা! অথচ, এখনি রেডি হয়ে বের না হলে সঠিক সময়ের মধ্যে ফ্যাক্টরির কাজে হাজিরা দেয়া ও সম্ভব হবেনা।উল্টো মিল অফিসের সুটকি টাইম কিপারের বাঁকা কথা শুনতে হবে।
অন্যদিকে, আবার বন পুকুরে ঠিক সময়ে গাড়ি পাওয়া ও বেশ কঠিন। তার উপর গন্তব্য যাত্রা আজিজ নগর’ শুনলে বাস হেলপারের ভেংচি, অসহ্যের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
তাই ভাবছিলাম এবার যে কোনভাবেই একটা বাই সাইকেল কিনে নেবো। আচ্ছা, নতুন একটা ফনিক্স সাইকেলের দাম কতো হতে পারে?দামের বিষয়ে সঠিকভাবে কে বলতে পারবে নুরুদ্দীন পেরাক?
তখনি মনে হল পাশের পাকঘর থেকে অতিসুক্ষ্মভাবে কেউ একজন আমার নাম ধরে খুব নরম আর মিষ্টি করে ডাকছে ! জ্বী, কনঠটা একজন নারীর, মায়াবতী একজন যুবতীর! আশ্চর্য্য তো!
কিন্তু কে এই রমণী, তাও এতো সকালে? আমি ব্যাচেলর মানুষ, পড়শী কোন কন্যার সাথেও আমার তেমন কোন সম্পর্ক হৃদ্যতা নেই। প্রায় সহায় সম্বলহীন সামান্য আয়ের যুবককে কোন নারী প্রশ্রয় দেবে বলেন?
– আবুল, তুমি কি আমায় শুনতে পাচ্ছো? এই আবুল শুনতে পাচ্ছো?
আরে আমার নামে যে এতো মধু তাতো আগে এভাবে কখনো খেয়াল করিনি!
কিন্তু কে এই মেয়ে, কোন শহুরে নাকি নাটুকে কন্যা? আচ্ছা,সে যদি কোন অশরীরী কিনবা ছদ্মবেশী পরীকন্যা হয় তবে?
আরে,এই সাত সকালে এসব আমি কি ভাবছি!
তখনি মোহাম্মদ রফি গান নিয়ে স্বয়ং নুরুলদীন পেরাক হাজির!
বাহার ফুল বারাসাও মেরা মেহবুব আয়া হে –
দোস্ত আজ তোমার সাথে আজিজ নগর যাবো, চলো.
-আরে না চাইতেই বৃষ্টি! নুরু তুমি? সত্যি কি যে ভাল লাগছে!
-আচ্ছা চলো মেরা জান আবুল মিয়া এন্ড কোম্পানী।
– বন্ধু একটু অপেক্ষা করো,যাষ্ট শার্ট-প্যান্ট পরবো।
তারপর তড়িঘড়ি করে বাড়ির টিনের দরজায় তিব্বত তালা ঝুলিয়ে বন পুকুরের পথে নামলাম দু’ পরানী দোস্ত।
অথচ, কি আশ্চর্য একবারের জন্যও সেই রহস্য কন্যার কথা মনে আসলো না! তবে কি আমি যা শুনেছি তা আমি নিজেই বিশ্বাস করিনি!
………………………………………………………………………………….
অতঃপর সেই পুরনো রুটিন!
কাজ শেষে সন্ধ্যা রাতে আজিজনগর হয়ে চুনতি বনপুকুর এসে চা- দোকান আড্ডা,কবিগান কখনো বা মারফতি, মুর্শিদি আর কারবালার শোক জারি।অন্যভিন্ন জগতে উড়ে উড়ে থাকি- কি এক মোহ ভাল লাগায় বুদ হয়ে ভাবি’ কি আছে জীবনে!
অতঃপর নির্জন পাহাড়ি পথে কুমুদিয়াডুরির পথ ধরা- উঠে আসে মাসিক বাজেট, নিয়মকার চট্রগ্রাম শহর যাত্রা আর পরবর্তী গমনের আনুমানিক চিকিৎসা ব্যয়। জ্বী,বেশ কিছুদিন ধরে আমার শরীরটা খুউব খারাপ যাচ্ছে।
আরে হঠাত করে এমন পাহাড়ি সব ফুলের গন্ধ কোথা থেকে আসছে! পুরো পথটাই দেখছি সুরভীতে ভরে যাচ্ছে! আচ্ছা, এখন কত দূর এলাম?
রিক্সা কোম্পানি মতলবের বাড়ি ফেলে এখন টেকনাফ জুলুর মা’ র বাড়ি অতিক্রম করছি আর সামান্য পরেই পাহাড়ি রাস্তা যেটা বাম দিকে নেমে গেছে তা ধরে মাত্র চারশো গজ এগুলেই হাতের ডানে দক্ষিণের মাটি ছনের জীর্ণ ঘরটা আমার, একমাত্র পৈতিক সম্পত্তি।
আর তখনই ঘটনাটা ঘটলো!
হঠাত করে মনে হলো আমার পিছনে কেউ একজন আছেন।
চট করে পিছন ফিরতেই দেখি কেউ নেই অথচ বাতাসে তার পুরো অস্তিত্ব! বকুল ফুলের গন্ধ উতরিয়ে নামছে অন্য এক রমণীয় খুশবু! ভেজা ভেজা মিষ্টি এক মাদকতা যেন মূহুর্তেই আমায় অচেনা এক পেলব বুকের ভিতরের ভিতরে টেনে নিয়ে গেলো!
অতঃপর মাতালের মতো টলতে টলতে কখন যে আমার শীর্ণ কুটিরের সামনে এসে দাঁড়িয়ে গেলাম তা বুঝতেই পারিনি।
তারপর কখন যে দরজার তালা খুলে বাড়ির ভিতর প্রবেশ করলাম তা মনেই নেই।
মশার ক্রমাগত কামড়েই মনে হয় একসময় বাস্তবে ফিরে এলাম।
অনেক কষ্টে হাতরিয়ে হাতরিয়ে যখন বিদ্যুতের সুইচে হাত দিলাম তখনি মনে হলো আমার ঘাড়ের পিছনে কারো তপ্ত এক দীর্ঘশ্বাস এসে পরেছে। নিমেষেই ভয়ের তীব্র শীতল এক স্রোত বেয়ে নামলো দেহ মনে। এসবের মানে কি, আমাতে কি কোনো অশরীরী ভর করতে চায়?
আরে এটা কার বাড়িতে ঢুকে পরেছি! এতো নিপুণ ভাবে সাজানো গোছানো সব আসবাব! প্রাচীন খাটে সদ্য ঝকঝকে খয়েরী রঙ আচঁড়, বার্মিজ বড় বড় লাল গোলাপের আনকোরা চাদর, ম্যাচ করা পিলুতে অন্য এক মায়া দ্যুতি, শিয়রে ভাঁজ করা নকশী কাঁথা! পাশের টেবিলে দুধ সাদা কভারের মাঝ বরাবর স্বচ্ছ ফুলদানি-কয়েক মুঠো তাজা রজনীগন্ধা!
দেয়াল তাকের ভাজে শিরদাঁড়া মেরুদন্ড দেখিয়ে অনবদ্য সব পুস্তক – ফুটন্ত গোলাপ, ক্ষমা চাই শরীফার মা, যে ফুল না ফুটিতে,গরীবের মেয়ে আর উন্নত জীবন!তার এক বিঘাত উপরে কাল্পনিক বোরাক’ ছবির ক্যালেন্ডার, আজকের তারিখে গোল এক শুন্য মার্ক!
এসবের মানে কি?
হতে পারে আমি স্বপ্নের ঘোরে আছি অথবা স্রেফ পাগল হয়ে যাচ্ছি।
কিন্তু না, এই তো আমি ঠিকই জেগে আছি আর অকল্পনীয় রুচির শোভাবর্ধন দেখে বিস্মিত হচ্ছি এবঙ এই বাড়িটাও আমার।
জ্বী, নিশ্চয়ই আমার উপর কোন মায়াবতী রমণীর ছায়া পরেছে! কিন্তু কেই নারী, যুবতী না মাঝবয়সী? মানবী না অপ্সরী পরী?
তখনি আরেক দফা মিষ্টি সৌরভে পুরো ঘর ভরে উঠলো-মনে হলো কেউ একজন আমার খুব কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন! এবঙ নিশ্চয়ই তিনি একজন নারী।কারণ একজন পুরুষ কখনো অন্য একজন পুরুষের এতটা নিকট নিবিড় হতে পারেনা।
– এতক্ষণে তোমার আসার সময় হলো!না এলেই হতো।
আরে এতো সকাল বেলার সেই অদৃশ্য কন্যার যাদুকরী কন্ঠ!কি করি,এখন কি করি? দরজা খুলেই ঝেড়ে দৌড় দেবার চেষ্টা করলে কেমন হয়? সোজা এনায়েত মিয়াজির বাড়ি?
না,তাতে হান্ডেড পারসেন্ট রিস্ক- ঘাড় মটকে দিতে পারে পেত্নীর বাচ্চা, শাকচুন্নী মহাশয়া।
পরদিন সকাল কিংবা ভর দুপুরে আবিষ্কার হবে আমার লাশ! মৃতদেহের কোথাও কোন আঘাতের চিহ্ন না থাকলেও ঘাড়টা একদিকে কাত হয়ে আছে,গর্তে বসা চোখ দু’টোতে আতংকের সুস্পষ্ট ছাপ সবার সন্দেহের উদ্রেক করবে- ‘নিশ্চয়ই অসাম্ভাবিক মৃত্যু হয়েছে এই এতিম নিরীহ যুবকের’?
অতঃপর পাড়ার দেরাচ মিয়া টি ষ্টলে’ ভৌতিক সব কাহিনির বয়ান উঠে আসবে একের পর এক! চিনি চা-পাতায় টান পরবে, দ্রুত ফুরাবে বড় কলার কান্দি!
এই যে সাহেব, কি ভাবছো? ওসব লম্বা চিন্তা বাদ দিয়ে চট করে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়েমুছে ফ্রেশ হয়ে এসো, টেবিলে খানা দিচ্ছি, দেরি করলে ঠান্ডা হয়ে যাবে।
তারপর মন্ত্রমুগ্ধের মতো কখন যে কলতলা গেলাম আসলাম বুঝতেই পারিনি! কিন্তু ঘরের চৌকাটে ফের পা দিতেই সু-স্বাদু সব খানার গন্ধে খিদেটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো!
আশ্চর্য! একবারের জন্যও কেন মাথায় এলো না এক অদৃশ্য রহস্যময়ীর একের পর এক ভয়ানক সব চমকের পরেও কিভাবে আমি এমন সাম্ভাবিক আছি! এখনো ভয় না পেয়ে এই রমণীর রমণীয় গুণে মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছি!
তবে কি এসব কিছু আমার মন কল্পনায় ছিলো, নারীর নরম নরম ভালবাসার পরশ ছুঁয়ে যাবে আমাতে!
টেবিল ভর্তি সব উপাদেয় খানা পিনে! রূপার থালায় চিকন লম্বা চালের সুগন্ধি ভাত, নকশী পেয়ালায় খাসির কোরমা, মাছ আকৃতির মাটির প্লেটে ভাজা ইলিশ! কলাপাতায় শুকনো মরিচ পোড়া, সম্ভবত জলপাইয়ের আচারের তেলেই চকচকা!পাশেই বোনপ্লেট,স্লিম এন্ড ক্লিন গ্লাস আর মাঝ টেবিলে স্বচ্ছ কাঁচের পানি ভর্তি জগ।
সবে মন লাগিয়ে ভরপেট খেয়ে উঠেছি সবে এবার একটা নিকোটিন নেবো তখনি দেখলাম টেবিল থেকে আগের পদ সব গায়েব!
কি হচ্ছে এসব, কেন হচ্ছে, কেন করছেন এই জ্বীনবাজি ভাবার মাঝেই ঝুড়িভর্তি করে এলো ফলমূল আর রকমারি মিষ্টি! আম,আপেল আর রস মালাইয়ের সাথে বড় বড় স্পঞ্জ মিষ্টি!
তারপরেও কোন একটা পদের’ নিশ্চয়ই কমতি ছিলো ? আরে তাইতো! আইটেমের মধ্যে আসল জিনিসটাই বাদ রেখেছে! লেবু!
অবশ্যই, এবার আমি আমার সব চাপা প্রশ্নের জবাব পেতে শুরু করেছি!
সূত্রঃ জ্বীন তাড়াতে কাঁচা লেবু।
অবশ্যই আমি বিবেচক তাই নেপথ্যে নারীর এই মিষ্টি ভালবাসার প্রতিদান দিতে উনাকে সরাসরি কোন প্রশ্ন না করে কেবল বল্লাম- ধন্যবাদ পর্দাশীল নারী। অসুবিধে না হলে যদি পরিচয় দাও,তোমার বিস্তারিত বলো, তবে কৌতুহল মিটে।
-আমি পরীকন্যা জেবা মালিক। চুনতি হাটখোলা মুঁড়ার মরহুম শাহদীন মালিকের ৩৬ তম কন্যা আর পরীকন্যা তাছলিমা মালিকের বড় বোন।যদিও আমাদের মা দু’জন- কুলসুম মালিক আর আদিবা মালিক।আমি বড় মায়ের ঘরের মেয়ে।
– বলে যাও প্লিজ.
.
– বাল্যকালে আমি বাবার সাথে মিশর চলে গিয়েছিলেম আর সেখানেই আমার বেড়ে উঠা,লেখাপড়া সব।আমি এবার মানব চরিত্র’ বিষয়ে অনার্স করলাম আর গত মাসে চুনতি এসেই তোমার প্রেমে আটকে গেলাম!
– কি যা তা বলছো? আমার মাঝে এমন কি আছে, যাতে তুমি আকৃষ্ট হলে?
– তোমার মিষ্টি চেহারা, সুন্দর স্বাস্থ্য, শরীরে মাখা আরবের সেই মন পাগল করা সুরভী আর গম্ভীর বয়স আমায় উতলা করেছে আরবার। তার উপর সেদিন বিকেলে বন পুকুরে তুমি একটা তেঁতুল গাছের ছবি তুলেছিলে তখন বৃক্ষের একদম নিচের ডালে ছিলাম আমি।ব্যস্! সর্বনাশ হয়ে গেলো আমার।আমি তোমার জীবন ফ্রেমে আজীবনের জন্য আটকে গেলাম!
– কিন্তু তুমি হলে পরী আর আমি সামান্য খেটে-খাওয়া একজন মানুষ, আমাদের মাঝে যে অনেক অমিল মিলন হবে কিভাবে?
– দেখো মহান রাব্বুল আলামীন আমাদের একটা বিশেষ উপায় শিখিয়ে দিয়েছেন যার সাহায্যে আমরা জ্বীন জাতিরা আমাদের রূপ-বেশ পরিবর্তন করতে পারি তাই আমি নারী রূপ নিয়ে তোমার স্ত্রী হতে পারি।দয়া করে শুধু বলো, তুমি কি এই সাদি’তে রাজী? কথা দিচ্ছি ১০ জন মিশকীনকে একবেলা ভাত খাওয়ালেই আমার মোহরানার দাবী আমি ছেড়ে দেবো।
– তার আগে বলো আজ তুমি আমার বাড়িতে এতকিছু কিভাবে করলে, আসবাব থেকে খানাপিনার ব্যবস্থা?
– জ্বী, আমার কাছে সঞ্চিত বেশকিছু ডলার, টাকা আর সোনার অলংকার আছে, তার সামান্য কিছু ব্যয়ে বাজার সওদা’ই করে নিজেই রান্নাবান্না করেছি তেমনি ফুলের চাদর, টেবল কভার আর পুরানো খাটে পলিশ আদর অন্য এক মানুষকে টাকা দিয়ে সেরে নিয়েছি।
– আমি তো এখনো তোমায় দেখলাম না, মত দেই কিভাবে? তোমার বয়স ই বা কতো চলছে এখন?
– কিন্তু তুমি যদি আমাকে আমার আসল রূপে দেখো তবে তুমি তা সহ্য করতে পারবেনা।কারণ, আমাদের স্ত্রী জাতির সৌন্দর্য্যই আলাদা এবং অন্য এক তেজ দ্যুতি’তে কড়া প্রখর আবার ভরা রজনীর মতো মায়াবী উর্বর।
বয়সের কথা বলছো? আমার এখন ১৮০ বছর বয়স হলেও তোমাদের পরিমিত গম্ভীর হিসাবে ১৮ বছর।মানুষের সময় হিসাব থেকে আমরা জ্বীনেরা সব সময় ১০গুন পিছিয়ে আছি।
– না, আমি তোমার আসল রূপেই তোমাকে দেখতে চাই, আর তা এক্ষুণিই, নইলে তুমি যেতে পারো।বিদায়।
পরক্ষনেই,পূর্ণ বিদ্যুতেও চারপাশ ঘন অন্ধকারে ছেয়ে গেলো! বারান্দা ঘরে ঘূর্ণিঝড় এসে সব লন্ডভন্ড করা শুরু করলো! সশব্দে পতন ঘটছে একের পর একের- তাল পাখা, দেয়ালে টাংগানো সব আদি নিশান- সেই বাণী চিরন্তনী’-‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে’।
কাঠ ফ্রেমের উপর ভাংগা কাঁচের টুকরো, কণা।প্রাণভয়ে ভীত সদ্য লেজখসা এক টিকটিকি।
পর মুহূর্তেই হাজার ভোল্টের আলোতে ভরে গেলো গোটা রুম!
ঘরের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন এক অপরূপা!
‘মধ্যযুগীয় রাজকন্যাদের মতো ইউ গলা লম্বা ঘাঘরার উপরের অনাবৃত অংশ জুড়ে বিশাল এক সোনার হার।লম্বা কানে ইয়া বড় বড় দুল।প্রশস্ত কপালে বাঁকা চাঁদ টিপ’।
কিন্তু একি! মেয়েটা এতো খাটো কেন? উচ্চতা বড়জোর তিন ফিট দুই তিন ইঞ্চি!
কন্যা কি তবে নেহায়েত এক বালিকা! না, তার ভারী পদ সবে যে, যৌবনের বন্যা! তবে কি সে বামন?
…………………………………………………………..
তখনি সুন্দরীর রূপের প্রদর্শন শুরু হয়ে গেলো- আস্তে আস্তে মেলে যাচ্ছে পিঠের পিছনের রঙিন দু’ ডানা! আর তার মিষ্টি অবয়ব ক্রমশ মায়াতে ভরে উঠছে!মধু ঝরছে লাল টকটকে চিকন দু’ ঠোটে!
– কি ব্যাপার পরী জেবা! তুমি লিলিপুট বেশে কেন?রুচিতে বাধঁছে বড়, পারলে উচ্চতা বাড়াও আরো আরো।
– না তা সম্ভব নয়, মূল বেশ আকৃতিতে আমরা এমনিই।
তারমানে, তোমরা খাটো? অথচ, আমরা মানুষেরা তোমাদের নিয়ে কতো রকমের স্বপ্ন গল্প ফাঁদি!
– আচ্ছা, তার মানে আমাকে তোমার পছন্দ হয়নি?
– না ঠিক তা না।তোমার শারিরীক উচ্চতা নিয়ে ভীষণ অস্বস্তিতে ভুগছি,বিষয়টা কেমন যেন অরুচিকর।
– দেখো মানুষ আমি যদি ছলনা করে অন্য কোন রুপসী মানবীর উচ্চতায় ছদ্মবেশ নিতাম তখন কি আমায় এমন তুচ্ছ তাচ্ছিল্য অবহেলা করতে?
-ছল-চাতুরীতে ভালবাসা দীর্ঘস্থায়ী হয়না নিশ্চয়ই তা তুমি ভাল করেই জানো?
– আচ্ছা, যা হবার তা না হয় পরেই হবে- তুমি এখন শুতে যাও,আজ সারাদিন মেলা চমক আর ধকল গেছে তোমার।
– জ্বী, তাই ভালো।সরি জেবা’ কটুক্তি করে অনেক কষ্ট দিয়েছি তোমার মনে।
-শিকেয় তুলে রাখো ওসব মেকি কথা এবঙ শুভ রাত্রি যাত্রা।
…………………………………………………………………
শেষ রাতে নরম তুলতুলে এক পরশে অনভ্যস্ততায় চমকে উঠি!বেড়াল, নাকি সেই খাটো মায়াবিনী?
পরম মমতায় আমাকে তার বুকে তুলে রেখেছে পরী! অন্যহাতে মাথা পিঠে আদর করছে যেন আমি এক নেহায়েত দুগ্ধ শিশু! আরে রমণী! আমি কে হই তোর, সন্তান নাকি সখা পুরুষ?
কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো,মায়াবতীকে আমি’ কিছুতেই এড়াতে পারলাম না উল্টো ঘুমের ভান করে মায়ায় ডুবে যেতে যেতে ভাললাম- এতো সুখ ও ছিলো এই ফাটা কপালে!
………………………………………………………………………………
কিন্তু না, ক’মাস যেতে না যেতেই এক অস্থির ঝড়ে আমার সুখের ঘর নড়েবড়ে উঠলো!
কাজ শেষ সবে বাড়ি ফিরেছি ঠিক তখনি দেখলাম এক মাঝবয়সী ভদ্রমহিলা হতচকিত হয়ে উঠোনে দাঁড়িয়ে আছেন! পাশেই ধূলোর মাঝে বিশাল পেটুক এক গ্যানিব্যাগ, একজোড়া লাল মোরগ-মুরগী।
আচ্ছা,তারাকি পরস্পরের পূর্বপরিচিত , তাদের মাঝে কি হৃদয়ঘটিত কিছুআছে , পক্ষীকুলের মধ্যে কি মনের চর্চা চলে? দূরএসব আমি কি ভাবছি !
-আরে মাইন্যা ফুফু?
-ফুফুকে মনে আছে তাহলে !
-কি যে বলো, আমার মরহুম বাবার একমাত্র বোন তুমি, তোমাকে কিভাবে ভুলি !
-শোকর আলহামদুলিল্লাহ, তা বাবা কেমন আছিস ?
-ভাল আছি ফুফু।আচ্ছা ফুফু বাড়ির সামনে তুমি এভাবে বিস্মিত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলে কেন ?
– আশ্চর্য্য হবোনা ! বাড়ির এমন মায়াভরা রূপ আর পরিবর্তন, চারপাশে লতায় পাতায় মাচান ঘেরা! আচ্ছা,বাবা বাড়ির সামনে এতো বড় জবাফুলের বাগান করেছিস কেন ?
– কেন ফুফু, অসুবিধে কোথায়!
-আরে জবা ফুলে যে পরীর আসন তুই কি তা জানিসনা !তার উপর তুই আবার অবিবাহিত যুবক !
– বাদ দাও ফুফু,বাড়ির ভিতর চলো-
—————————————————————-
-আরে হারামজাদা বিয়ে করেছিস তা প্রথমেই স্বীকার করলেই পারতি !
-আমি বিয়ে করলাম কখন?আর করলেও তা তোমার কাছে গোপন করবো কেন !ওহ ! বুঝেছি, মনির কথাটা এখনো ভুলোনি! আরে ফুফু,ফুফাতো বোন হলেও মনিকে আমি বোনের দৃষ্টিতেই দেখি! আচ্ছা,ফুফু ওর স্বামীর দুবাই যাত্রার অগ্রগতি’’কতদূর?
-জামাইকে বিদেশ পাঠানোর শর্লা করার জন্যইতো তোর কাছে আসা।তুই ছাড়া আমার আর কেইবা আছে বল ?
– ভিসা নিতে কতো টাকার প্রয়োজন?
– ভিসা রেডি আছে, এখন দেড়লাখের মধ্যে বাকি ৬০ হাজার টাকার ব্যবস্থা করতে পারলেই মুখ রক্ষা হয়।
– তাই নাকি, নব্বই হাজার টাকা তো অনেক টাকা, ব্যবস্থা করলে কিভাবে?
– তোর ফুফার রেখে যাওয়া একমাত্র জমিটা বিক্রি করেছি এখন বসত ভিটাটা ছাড়া আর কিছুই বাকী রইলনা।
-ঠিক আছে ফুফু, তুমি চিন্তা করোনা, আমি যেভাবে পারি টাকার জোগাড়’করে দিবো।
– কিভাবে করবি!
– প্রয়োজনে আমি ভিটা-বাড়ি বন্ধক রেখে ঋণ নেবো। নাহলে মায়ের গহনাগুলো বিক্রি করে দেবো।
– আমি জানতাম তুই ঠিক এমনি একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে হলেও আমাকে লজ্জার হাত থেকে উদ্ধার করবি।
-এখন এসব কথা বাদ দাও ফুফু, অনেক দূর থেকে এসেছো আগে রেস্ট নাও তারপর যা করার তা ভেবে চিনতে করা যাবে।
– আচ্ছা বাবা এখন বল বৌমা কই? বাপের বাড়ি বেড়াতে গেছে? কখন ফিরবে?
– ফুফু তুমি আবারো সেই একই কথা বলছো! আমিতো এখনো বিয়েই করিনি।
– তাহলে বল, তোর বাড়িতে কোন মেয়ের হাতের ছোঁয়া লেগেছে? এমন সুন্দর করে সব বিছানাপত্র,পর্দার ঘেরা মনোরমভাবে’সাজিয়ে ঘরের মেঝটা পর্যন্ত ঝকঝকে তকতকে করে রেখেছে আর চারপাশে যেদিকেই তাকাচ্ছি সেদিকেই আমি যেন একজন মায়াবতী রমণীকে দেখতে পাচ্ছি !কে সেই মেয়ে, এই পাড়ার নিশ্চয়ই? মা মণির বাপের নাম কি ? বলিস তো আমি আগামীকাল সকালেই তার অভিভাবকের সাথে তোদের বিয়ের বিষয়ে কথা বলবো।
– কি যে সব ভাবছো! আমার এমন একান্ত কেউ নেই আর থাকলে অবশ্যই তা তোমার কাছে গোপন করতাম না।
– আরে ব্যাটা ছেলেদের এত শরম থাকতে নেই! আর আমার কাছে তোর কিসের এত সংকোচ!
বুঝলাম কোনোভাবেই ফুফু’কে ক্ষান্ত করা যাবেনা,যাকগে , উনার যা ভাবার তা উনি ভাবুক।এদিকে আমার ভীষণ টেনশন হচ্ছে কেবল জেবাকে নিয়ে। না জানি বেচারী কোথায় গিয়ে লুকিয়েছে।
আরে জেবা’ গেলো কোথায় ! পাকঘর, বাড়ির পিছনের বাদাম গাছ,পুরোনো উইয়ের টিবি কোথাও সে নেই!তবে কি সে আমার উপর বেজায় অভিমান করে অনেক দূরে চলে গেছে?এখন উপায়,তাকে কিভাবে ফেরাই?
ঘরের মেঝে বসে আছেন’ফুফু।উনার চারদিকে ছাড়ানো ছিটানো পানের সরঞ্জাম হরেক তেজের জর্দা মসল্লার কৌটার ছড়াছড়ি!মনে হয় পদের নির্বাচন চলছে!
– এই ফুফু, তোমার সাথে আনা সেই ব্যাগ আর মোরগ-মুরগি দুটো কই?
– কেন পাকঘরে রেখেছি, বেড়ালের উৎপাত আছে নাকি? আচ্ছা আগামীকাল সকালে আমি একটা ওষুধের নাম লিখে দেবো তুই শুধু বাজার থেকে এনে দেবি তারপর দেখবি হারামীর বাচ্চার আমি কি অবস্থা করি।রক্ত বমি করবে ইবলিশ ! রক্ত বমি ! উপযুক্ত সাজা হবে খবিসের !যেমন কর্ম তেমন ফল।
-আরে ফুফু তুমি এমন করে কথা বলছো কেন!যেন নেশায় ধরেছে ! আর কোন ওষুধের কথা বলছো ?
– আরে আহাম্মক বিষের কথা বলছি আমি-বিষ।
হঠাৎ করে যেন রাজ্যের ক্লান্তি এসে ভর করলো আমায়।
এভাবে কতক্ষন ঘুমিয়েছিলাম তা জানিনা তবে যখন ফুফুর ডাকে বিছানা ছাড়ছি তখন রোহিঙ্গা ঘোনা মসজিদ থেকে এশার আজান ভেসে আসছে।
-এই আবুল ‘ খাবি আয়।
-আরে ফুফু তুমি কেন কষ্ট করে রান্না করতে গেলে, আমাকে বললেই তো হতো!
খিঁচুড়ি ভাতের সাথে ডিম আলু ভাজি আর মরিচ পোড়ার চাটনি’তেলের রুপে চকচক করছে! আর খেতে বসেই বুঝলাম বাহিরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি নেমেছে!
এবার আর’কোনদিকে নজর না দিয়ে গ্রোগ্রাসে গিলছি। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে পানির গ্লাস হাত নিতে গিয়েই ধাক্কাটা গেলাম।
ফুফুর সামনে কাচের পিরিচে কুচিকুচি পেয়াজের পাশেই কয়েক খন্ড বাতাবী লেবু!
-হায়রে,হায়রে! জেবা’ না জানি কি বিপদে আছে?
একে কাঁচা লেবু তার উপর বাহিরে ঝড় বাদল। না পারছে সে ঘরে ঢুকতে না পারবে উড়াল দিয়ে নিরাপদ স্থানে যেতে।অবশ্য বৃষ্টি নামার আভাস যদি সে আগে থেকে না পেয়ে থাকে।
জ্বী, জেবা’ই একদিন আমায় বলেছিলো বড় বৃষ্টির সময় আয়োনাজাইশেন ও বজ্রপাতের তীব্র আলোক ছটায় তারা চলাচল সক্ষমতা হারায়।
কি করি আমি, কি করি ? ভাবতে ভাবতে এক সময় দায়িত্বজ্ঞানহীনবেয়াক্কেলের মতো ঘুমিয়ে যাই ! হয়তো যুক্তি দেখানো যেতে পারে প্রচন্ড উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা, ভাবনা, আশঙ্কায় আমি কাহিল ছিলাম।
যখন ঘুম ভাঙলো তখন দেখি ফুফুর মুখে খই ফুটছে!
-তুই ঘুমের ভিতর কার সাথে কথা বলছিলি ! না, লক্ষণ মোটেই ভাল নয়, আজই বাড়ির সামনের বাগানের সব জবা ফুল গাছ গুলো উপড়ে ফেলে মিয়াজী বাড়ি থেকে তাবিজ আনতে হবে- আছরমুক্ত না করলে একদিন শুনবো কোনো বদ পরীর কুনজরে পরে চ্যাবড়া হয়ে গেছিস।
– ফুফু এই সাত সকালে এসব কথা বন্ধ কর তো।
– তুই কালকের ছেলে জীন-পরী আর মায়াবিনীর মায়ার তুই কি বুঝবি! আচ্ছা বাদ দে, এখন তাড়াতাড়ি উঠ বাপ, মুরগিটা জবেহ করে নিয়ে আয়,দুপুরের খাবার খেতে হবে তো !
ফুফুর সব নির্দেশ আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে যখন আমার নার্সারিতে এলাম তখন মাথার উপর সূর্য!
সরি সুপ্রিয় পাঠক বলতে ভুলে গেছি গত’ক’মাস থেকে আমি নার্সারীর ব্যবসায় নেমে চাকুরীতে ইস্তফা দিয়েছি। আসলে জেবার পরামর্শেই আমি নানা-নাতি বাগানটা ১০বছরের জন্য লিজ নিয়েছি।
আপাতত আমার বাগানে ফুলের চাষ করেছি কারণ বর্তমানে ফুলের চাহিদা অনেক বেশি। মানুষ এখন বিয়ের গাড়ি সাজাতে, গুণীজনদের বরণ করে নিতে, জন্মদিনের অনুষ্ঠানে পূজা-পার্বণ, গায়ে হলুদ, একুশে ফেব্রুয়ারি,সভা-সমিতি ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ফুলের ব্যবহার করে অনেক বেশী।
আমার নার্সারীতে গোলাপ, গাঁদা, চামেলী, বেলি, জুঁই, শেফালি, রজনীগন্ধা, গন্ধরাজ, , শেফালি, হাসনা-হেনা, চন্দ্র মল্লিকা , ডালিয়া, দোলনচাঁপা, কনকচাঁপা, অপরাজিতা, মৌ-চণ্ডাল, টগর, জবা, মালতি, কামিনী ইত্যাদির চারা তুলছি।
আসলে গাছ আর চারার পরিচর্যাই হলো মূল। নিড়ানী দিয়ে আগাছা তুলছি আর ফাঁকে ফাঁকে গোড়ার মাটি আলগা করে দিতে দিতে ভাবছিলাম এবার জল সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। পিঁপড়া ও মাকড়সার অত্যাচার ঠেকাতে ও দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
ভাবনায় ছেদ পরলো আমার। সামনের শতবর্ষী তেঁতুল গাছের একদম নিচের রোগা একটা ডালে আমার দৃষ্টি আঠার মতো আটকে গেলো।
একি দেখছি আমি! উনি যে স্বয়ং জেবা মালিক ! আমার জেবা!
কিনতু পরীকন্যাকে এমন ফ্যাকাশে আর নির্জীব মনে হচ্ছে কেন ! হঠাৎ যেন আমার বুকের ভিতর ধক করে উঠলো!
জেবার সাথে খারাপ কিছু ঘটেনিতো? নাকি প্রাকৃতিক বৈরী আবহাওয়ায় সে ক্লান্ত আহত? শুধু কি তাই, মন ভরা অভিমানও নিশ্চয়ই আছে ?
তবু সাহসে বুক বেঁধে বৃক্ষের নিচে এসে নত মুখে তার নাম ধরে ডাকলাম – জেবা।
মুহূর্তেই জেবা এসে আমার বুকে ঝাঁপিয়ে পরলো।তারপর সমানে কিল-ঘুসি চালাতে চালাতে বললো-‘ পারলে তুমি’ পারলে ! গোটা একটা রাত আমায় ছেড়ে থাকতে ! এদিকে ঝড় বাদল যেন রাগ রোষ ঝেড়েছে আমাতে !
যাক,আমাদের একান্ত সেই মান-অভিমান,অভিযোগ, অনুযোগের বিস্তারিত না হয় আর নাইবা বললাম।
দুপুরে জেবা’কে বাড়ির বাহিরে রেখে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করলাম তারপর কাঁচা লেবুর পুঁটুলিটা খুঁজে পেতে বাহিরে এনে দূরের নর্দমায় ছুঁড়ে দিলাম।
এরপর ফুফুকে টাকার বিষয়ে নিশ্চিত করে বিকেলেই উনার বাড়ি পর্যন্ত একটা রিকশা ঠিক করে দিলাম।
যদিও ফুফু’কে এভাবে অনেকটা জোর করে বিদেয় দিতে হয়েছে বলে আমার নিজেও খুব খারাপ লাগছে।
তবে আমার সান্তনা’ একটাই আমার কাছে ফুফু’ যে প্রত্যাশা নিয়ে এসেছিলেন তা আমি পূরণ করতে পারবো। জ্বী, জেবা’ আমার পাশে থাকতে কড়ির চিন্তা কিসের?
…………………………………………………………………
তারপর কেটে গেছে একযুগ আর অনেক দিন- রজনী। এখন জেবা আর অপরিচিত কেউ নয়, আমারি একমাত্র সখি- দিবস নিশির সার্বক্ষণিক সংগী,আমারি বিবাহিত স্ত্রী,যাকে আমি অনেক বছর আগেই ইসলামী নিয়ম মেনে বিয়ে করেছি।
এই বিয়েতে বন্ধু নুরুদ্দিন-ই যাবতীয় সহযোগিতা করেছে, তার কাছে আমরা ঋণী।
এখন আমার’প্রতিদিন যেন স্বর্গের একেক দিন। ঘুম ভাংগে অতি পেলব এক স্পর্শে তেমনি উড়ে উড়ে যায় সারা সময়- মায়াক্ষণ!
সাধারণ যে কোন খাবারও মনে হয় চমৎকার এক স্বাদে ভরা। তার উপর নিত্যনতুন খাবার পদ আর পাশে বসে স্বয়ং রাঁধুনি জেবা। এটা ওটা পাতে তুলে দিয়ে বলে- এতো কম আহার খাবারে কি চলে।
ও প্রিয়, এটা অন্তত নাও, তোমার জন্য করেছি- কচুর লতি আর ইছা শুটকির আইটেম। আচ্ছা, বাদ দাও, এই পেপে ভাজিটা দিচ্ছি, এটা নাও। কই প্লেট টা এগিয়ে দাও।
যদিও যেদিন মাংস রান্না সেদিনই কেবল জেবা আমার সাথে খায় তবে তা আমার চিবুনো হাড্ডি, জেবা’ বিছমিল্লাহ বললেই তাতে আবার মাংসতে ভরে উঠে। সুবাহানাল্লাহ!
এরপর আদা, ঘি আর মধু চা’ তো আরেক আকর্ষণ। তবে দিনের তাপমাত্রা মেজাজের উপর নির্ভর করে কোনদিন কোন চা’ হবে আর রাতে কেবল আদা চা’ চলে।
অতঃপর এক সময় ঘুমিয়ে যাই মায়াময়ীর বুকের গভীরে পরম এক আদরে!
অথচ, নিন্দুকেরা পাড়ার চা- দোকান আড্ডায় আমাকে নিয়ে মজা করে বলে- ব্যাটারে ভূতে ধরেছে, নইলে কেউ আজিজ নগর ফ্যাক্টরির এতো ভাল চাকুরী ছেড়ে নার্সারি ব্যবসা করে!
কেউবা আরো দু’ লাইন একটু বাড়িয়ে বলে- ‘আমার মনে হয় আবুলের মানসিক সমস্যা হয়েছে, সারাক্ষণ সে কার সাথে যেন নিচু স্বরে কথা বলে। আর তার চোখেও কেমন যেন ঘোলা ঘোলা দৃষ্টি- দূর্বোধ্য! তাকে একবার পাবনা মেন্টালে নিয়ে ডাক্তার দেখানো অতি দরকার’।
আবুল নাকি রাতে তার বাড়িতে বাতি জ্বালায় না’?
‘ নুরুদ্দিন নাকি আবুলের পরানি বন্ধু,তাকে একবার আবুলের বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে কেমন হয়’?
কিন্তু কে করবে এমন দুঃসাহস’?
আমাদের নিয়ে এমনি হাজারো গল্প ভাবনার জন্ম নিচ্ছে হয়তো প্রতিনিয়ত যদিও এতে কিছুই আসে যায় না- উনারা আরো ভাবুক আর চারপাশে রঙ লাগিয়ে দিক’ এতে বরং আমি আনন্দিত। আহা, গ্রামের খেঁটেখাওয়া মানুষরা কতো সহজে মজা পায়,কল্পনার উপাদান খুঁজে ফিরে আরবার!
সুপ্রিয় পাঠক, জেবা মালিক’ গত সপ্তাহে মিশর গেছে তাই এই অবসরে লেখছি – রূপকথা সম আমার জীবন কাহিনী !
আচ্ছা , একটা কথা কিন্তু এখনো বলা হয়নি!
গত বছর একদিন ভরা জোছনায় জেবার ছোট বোনরা আমরা বাড়িতে এসেছিলো। শ্যালিকা তাছলিমা মালিক আর লুবনা মালিক। তবে ওরা’ পর্দাশীল বলে আমার সামনে আসেনি,, আড়াল থেকেই কথা বলেছে, তাও কর্কশ দরদহীন কণ্ঠে’ যাতে নফস রিপুর জালে আটকিয়ে না যাই !
পরিশেষে, আল্লাহর কাছে লাখো লাখো শোকর, কোন বদ মেয়েকে আল্লাহ আমার স্ত্রীর করে দেননি বরং অন্যকূলের হলেও একজন ধার্মিক সুন্দরীকে আমার সহধর্মীনি করে পাঠিয়েছেন।
শেষ।

কুমুদিয়াডুরি, চুনতি।
বুধবার, ০৯ মার্চ, ২০০৫ ইংরেজী।

সকাল- ৬টা ১৯ মিনিট।

About the author

lohagarabd

Leave a Comment