তরুণ আলোকিত ব্যক্তিত্ব

লোহাগাড়ার কৃতি সন্তান ক্ষুদে বিজ্ঞানী জাহেদ হোসাইন নোবেল

Written by lohagarabd

বর্তমান বিশ্বে রোবট এবং ড্রোনের চাহিদা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে এসবের ব্যবহারও বৃদ্ধি পাচ্ছে৷ চলতি শতাব্দীর মানুষ খুবই আরামপ্রিয়। তাই মানুষ এখন পরিশ্রম না করেই রোবট ও ড্রোনের সাহায্যে সব কাজ সেরে ফেলতে আগ্রহী। একবিংশ শতাব্দীতে প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন রোবট এবং ড্রোন। ভবিষ্যতে গ্রহান্তরেও রোবট ঝাঁক গড়ে তোলার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে অনেক রোবট বিজ্ঞানী ও গবেষকরা কাজ করে যাচ্ছেন। রোবটের পাশাপাশি ড্রোনেরও বিস্তর চাহিদা বেড়েছে৷ ড্রোন দ্বারা আজকাল ছবির শুটিং, বিভিন্ন উড়ন্ত শট , গোপন কাজে এবং গোয়েন্দা অভিযানে ড্রোনের কার্যকারিতা অনেক বেশি।


ব্যক্তিগত জীবনঃ


জাহেদ হোসাইন নোবেল চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়া উপজেলায় ১৪ মে ১৯৯৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। মরহুম জাকির হোসাইন এর দুই সন্তানের মধ্যে নোবেল দ্বিতীয়। লোহাগাড়া উপজেলার বড়হাতিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ মালপুকুরিয়া গ্রামে তাঁর পৈতৃক নিবাস হলেও তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয় লোহাগাড়া সদরে। সদরেই তাঁর শৈশব কাটে। লোহাগাড়ার অন্যতম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইকরা আব্দুল জব্বার উচ্চ বিদ্যালয়ে(পূর্বনাম ইকরা ইনস্টিটিউট) নোবেলের শিক্ষাজীবন শুরু হয়। শৈশব থেকেই খুব শান্ত প্রকৃতির ছেলে নোবেল। শিক্ষা জীবনের শুরু থেকেই মেধাবী ছাত্র ছিলো নোবেল। এরপর নোবেল দক্ষিণ চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ দক্ষিণ সাতকানিয়া গোলামবারী মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন। এই প্রতিষ্ঠান থেকেই নোবেল ২০১২ সালের জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় পেয়েছেন বৃত্তি এবং ২০১৫ সালের মাধ্যমিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ নোবেল। এরপর চট্টগ্রামের পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ইলেকট্রনিক সায়েন্স বিভাগে ভর্তি হন জাহেদ হোসাইন নোবেল।

উদ্ভাবনী প্রকল্প ও অর্জনঃ


নোবেল তখন চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ইলেকট্রনিক বিভাগের অষ্টম পর্বের শিক্ষার্থী। বাংলাদেশে বড় ধরণের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অনেক মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। ভবিষ্যতে এই ধরনের অগ্নি দুর্ঘটনা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার লক্ষ্যে নোবেলের অগ্নি নির্বাপক রোবট ফোর্সের উদ্ভাবন। কোথাও এমন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে আগুন থেকে মানুষকে বাঁচানো এবং অগ্নিকাণ্ডের স্থানে দ্রুত প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পাঠাতে ‘রোবট ফোর্স’ উদ্ভাবন করেছেন নোবেল।

অগ্নিকাণ্ড থেকে মানুষকে বাঁচাতে বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিসের জন্য এটি উদ্ভাবন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার ছেলে ক্ষুদে বিজ্ঞানী জাহেদ হোসেন নোবেল। মূলত তাঁর এই মহৎ উদ্ভাবন থেকেই তাঁর নামের পাশে যুক্ত হয়েছে ক্ষুদে বিজ্ঞানী।

চলতি বছর ঢাকায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ১৬ জুন ২০১৬ এ জাতীয় স্কিল কম্পিটিশন-২০১৮ এর চূড়ান্ত পর্বে তাঁর উদ্ভাবিত এই রোবটটি প্রদর্শিত হয়। এবং তাঁর এই উদ্ভাবিত রোবট ফোর্স প্রজেক্টটি প্রতিযোগিতায় তৃতীয় স্থান পায়। এর জন্য তার হাতে জাতীয় পুরষ্কার তুলে দিয়েছিলেন শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল।

রোবটটির সংক্ষিপ্ত কার্যপ্রণালী ও কার্যক্ষমতাঃ


১। রোবটটির বহন ক্ষমতা ১৮ কেজি। এছাড়া অগ্নিকাণ্ডের স্থানে রোবটটি প্রয়োজনীয় খাবার, ওষুধ ও মাস্ক নিয়ে যেতে পারবে। রোবটটি নিজেই অগ্নিকাণ্ডে সৃষ্ট কালো ধোঁয়া কুলিং সিস্টেম ব্যবহার করে ফিল্টার করে দেবে। তাছাড়া রোবটটি রিমোট কন্ট্রোলারের সাহায্যে এক কিলোমিটার দূরত্ব থেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন একজন ফায়ারম্যান।

২। মূলত ফায়ার সার্ভিসের জন্য রোবটটি উদ্ভাবন করা হয়েছে। রোবটটিতে অন্ধকারে আলোর সুবিধার্থে দুটি হেড লাইট এবং মনিটরিংয়ের সুবিধার্থে লাইভ ক্যামেরা ও জিপিএস ট্র্যাকিং সিস্টেম সংযোজন করা হয়েছে। আর পানি ছিটানোর জন্য লাগানো আছে নল।

৩। রোবটটি চালানোর সুবিধার্থে রোবটটির নিচের অংশে ৬টি চাকা লাগানো আছে। যার ফলে রোবটটি উচুঁ-নিচু জায়গায় ব্যবহারের উপযোগী। আর সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠার উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে ট্যাংকের আদলে রোবট। যেটি বহুতল ভবনের সিঁড়ি ভেঙ্গে উপরে উঠে আগুনের কাছে পৌঁছে যাবে। ওই সময় রোবটটি পরিচালনাকারী ফায়ারম্যান রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে পানি ছিটিয়ে কিংবা ফায়ার এঙিটিংগুইশার ব্যবহার করে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করবেন।
৪। আগুন নির্বাপন ছাড়াও রোবটটি কক্ষে আটকে থাকা মানুষকে হিউম্যান ডিটেক্ট সেন্সরের মাধ্যমে শনাক্ত করবে।

শৈশব থেকেই নোবেলের স্বপ্ন ছিলো বড় হয়ে দেশ ও জাতির জন্য এমন কিছু করবেন। তাঁর এই আত্মবিশ্বাস, অদম্য চেষ্টা ও কঠোর পরিশ্রম-ই তাঁর হাতে ধরা দিয়েছে এই সোনালি সাফল্য। অল্প বয়সী এই ক্ষুদে বিজ্ঞানী খুব অল্প সময়েই পেয়েছেন একে একে কয়েকটি জাতীয় পুরস্কার।

তাঁর উদ্ভাবনী প্রকল্পের মাধ্যমে অর্জনসমূহঃ


👉 আইসিটি এক্সপো ২০১৭ তে ৭ম স্থান;
👉 ২০১৭ সালে স্কিল কম্পিটিশন কলেজ লেবেলে ১ম স্থান;
👉 রিজিওনাল লেভেলে ৩য় স্থান;
👉 চতুর্থ জাতীয় উন্নয়ন মেলা ঢাকা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ২য় স্থান;
👉২০১৮ সালে তার উদ্ভাবিত ‘বাংলাদেশ রোবট ফোর্স’ প্রজেক্টটি স্কিল কম্পিটিশন-২০১৮ তে ইনস্টিটিউট পর্যায়ে প্রথম স্থান;
👉স্কিল কম্পিটিশন-২০১৮ তে চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পর্যায়ে প্রথম স্থান;
👉৫ম চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলা-২০১৮ তে প্রথম স্থান;
👉১৬ জুন জাতীয় স্কিল কম্পিটিশন-২০১৮ তে তৃতীয় স্থান অর্জন করে জাতীয় পুরস্কার লাভ;
👉১৭ জুন জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলা-২০১৯ এ চট্টগ্রাম জেলা চ্যাম্পিয়ন ;


👉২৭ জুন ২০১৯ ঢাকার জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরে অনুষ্ঠিত ৪০তম জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলা-২০১৯ এ সিনিয়র ক্যাটাগরিতে দেশসেরা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন;

👉 সর্বশেষ গত ২৯ আগস্ট ২০১৯ বঙ্গবন্ধু স্মারক পুরস্কারে ভূষিত হলেন বাংলাদেশ রোবট ফোর্স আবিষ্কারক ক্ষুদে বিজ্ঞানী জাহেদ হোসাইন নোবেল। রাজধনীতে অবস্থিত জাতীয় বিজ্ঞান ও জাদুঘর মিলনায়তনে আয়োজিত বঙ্গবন্ধুর ৪৪তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে ‘বঙ্গবন্ধু স্মারক পুরস্কার’ এবং ‘বঙ্গবন্ধু অলিম্পিয়াড পুরস্কার’ প্রদান অনুষ্ঠানে ৪০তম জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহে সিনিয়র গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।

About the author

lohagarabd

Leave a Comment