আলোকিত ব্যক্তিত্ব

আলহাজ্ব মৌলানা মুসলিম খান স্মরণে

বাংলাদেশের অন্যতম সেরা দ্বীনি প্রতিষ্ঠান চুনতি হাকিমিয়া আলিয়া মাদ্রাসার প্রাক্তন ছাত্র প্রায় অর্ধ শতাব্দীকাল ধরে অত্র মাদ্রাসার পরিচালানা কমিটির সদস্য চুনতি গ্রামের সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান আলহাজ্ব মৌলানা মুসলিম খান গত ২৪ রমজান নগরীর একটি ক্লিনিকে ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহে… রাজেউন) ।


সাতকানিয়া থানার অন্যতম জমিদার করম আলী দারোগা ছিলেন খান সাহেবের দাদা। করম আলী দারোগার মেঝ ছেলে মৌলানা আবদুস সোবহান সাহেবের দ্বিতীয় পুত্র মুসলিম খান। অল্প বয়সে পিতৃ বিয়োগ ঘটলেও আবদুস সোবহান সাহেব পড়ালেখা ক্ষান্ত হননি। স্বীয় প্রচেষ্টা ও পিতার পৈত্রিক জমিদারীর সুযোগে তিনি উচ্চতর শিক্ষা অর্জনের জন্য ভারতের দেওবন্দ মাদ্রাসায় চলে যান। ভারতে উচ্চ শিক্ষা শেষে তিনি তাৎক্ষনিক দেশে ফিরে আসেননি। বরং পিতার জমিদারীর মোহ ত্যাগ করে নিজের একক প্রচেষ্টায় কিছু একটা করার মানসে কলকাতায় করোয়া রোডে খান টী কোম্পানি নামে চা এর ব্যাবসা শুরু করেন এবং এই ব্যাবসায় তিনি যথেষ্ট উন্নতি লাভ করেন । মৌলানা আবদুস সোবহান সাহেব ব্যাবসার চাইতেও বেশি খ্যাতি অর্জন করেন বিশিষ্ট আলেমেদ্বীন হিসেবে। সেই সূত্রে তিনি ১৯২১ ইংরেজী সনে চুনতি হাকিমিয়া আলীয়া মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা অলিকুল শিরোমনি হযরত মৌলানা আবদুল হাকীম সাহেবের পুত্র খান বাহাদুর ওয়াজি উল্লাহ সামীর নাতনী করম নিগারের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং ১৯২৩ ইংরেজী সন থেকে চুনতি গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
১৯৩৩ ইংরেজি সনে মৌলানা আবদুস সোবহান ও বেগম করম নিগারের ঘরে মৌলানা মুসলিম খান জন্মগ্রহন করেন। তিনি তাদের দ্বিতীয় সন্তান, তাঁর বড় ভাই বিশিষ্ট ব্যাবসায়ী ইসলাম খান। পিতার মত মুসলিম খানও ছিলেন প্রখর মেধার অধিকারী ।
শৈশবেই তাঁর মেধার পরিচয় পাওয়া যায়। পিতার সার্বিক তত্ত্ববধানেই তাঁর লেখাপড়া চলে। যুগশ্রেষ্ট শিক্ষকদের নেক নজরেই তাঁর উচ্চ শিক্ষা লাভ হয়। তাঁর শিক্ষকদের মধ্যে মুফতি মৌলানা ইব্রাহীম, মৌলানা মীর গোলাম মস্তফা, মৌলানা মোজাফফর আহমদ ও মৌলানা আবদুর রশিদ সাহেব প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।
চুনতি হাকিমিয়া আলীয়া মাদ্রাসায় আলিম পর্যন্ত পড়ে তিনি ফাজিল পড়ার জন্যে গারাঙ্গিয়া আলীয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। মাদ্রাসায় পাঞ্জাবীর পরিবর্তে শার্ট পরিধান করার কারণে মাদ্রাসা থেকে তাকে বহিহাস্কারের কথা উঠলে পোষাক বিতর্কে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন যুগ শ্রেষ্ট আলেমেদ্বীন প্রখ্যান মুহাদ্দিস আল্লামা আমিন উল্লাহ সাহেব। তিনি সিদ্ধান্ত নেন মুসলিম খান মাদ্রাসায় আর ক্লাস করবেন না । ক্লাস না করেই নিয়মিত ছাত্র হিসেবে ফাজিল ফাইন্যাল পরীক্ষায় অংশ নেবে। সিদ্ধান্ত মোতাবেকনিতি ক্লাস না করেই নির্বাচনী পরীক্ষায় ১ম হয়ে সবাইকে চমকে দেন এবং ফাইন্যাল পরীক্ষায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ১ম স্থান ও অবিভক্ত পাকিস্তানে ৭ম স্থান অর্জন করে রেকর্ড রেজাল্টের মাধ্যমে তিনি তাঁর মেধার স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হন।
কৃতিত্বের সাথে ফাজিল পাশ করার পর তিনি চট্টগ্রাম শহরের কাজেম আলী উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেনীতে ভর্তি হন। এই স্কুল থেকে কৃতিত্বের সাথে এসএসসি এবং মহসিন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন।  ১৯৫৯ সালে মৌলানা মুসলিম খান চট্টগ্রামে ইসলামীয়া লাইব্রেরীর মালিক বিশিষ্ট আলেম আলহাজ্ব মৌলানা শামসুল হুদা খান সিদ্দিকী সাহেবের ৩য় কন্যা রায়হা বেগমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর ৫ ছেলে ও ৪ মেয়ে বড় ছেলে হাবিব খান পিতার প্রতিষ্ঠিত ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান হাবিব প্রিন্টিং প্রেস পরিচালনা করছেন। সিকদারপাড়া ছলিমুল উলুম এতিমখানা ও হেফজখানার নির্বাহী সদস্য মৌলানা মোজাম্মেল হক তাঁর বড় জামাতা এবং জামায়াতে ইসলামী বাংলদেশ চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আমির জাফর ছাদেক মুসলিম খান সাহেবের মেঝ জামাতা। পঞ্চাশের দশোকে তিনি রেডীও পাকিস্তান এর উর্দু সংবাদ পাঠক হিসেবে মনোনীত হলেও শেষ পর্যন্ত ব্যাবসাকেই পেশা হিসেবে গ্রহন করেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে হাবিব প্রিন্টির প্রেস প্রায় পঞ্চাশ বৎসর যাবৎ সুনামের সাথে ব্যাবসা করে যাচ্ছে। এছাড়াও তাঁর অসাধারণ সাংগঠনিক ক্ষমতা ও দক্ষতা ছিল। তিনি চট্টগ্রাম মুদ্রাক্ষর সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি , চুনতি হাকিমিয়া আলীয়া মাদ্রাসায় প্রায় অর্ধশত বৎসর যাবৎ পরিচালনা পরিষদ এর সদস্য, চুনতি সীরাত (সঃ) মাহফিল-এ ১৯৭৩ হতে ২০০৭ সন পর্যন্ত পরিবেশন ও অর্থ বিভাগে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন।
আরবী,ফার্সী,উর্দু, ইংরেজী, তফসীর , হাদিস , ফিকাহ, নাহু মানতিক সহ সর্ব বিষয়ে তাঁর জ্ঞান ছিলো অসাধারন।

আজীবন সামজিকতায় জড়িত এ মহাপ্রয়াণ ২০০৭ সনে ৭ অক্টোবর, ২৪ রমজান ১৪২৮ , ২২ আশ্বিন ১৪১৪, রোববার ভোর ৪-১০ মিনিটে মেহেদীবাগস্থ ন্যাশনাল হাসপাতাল লি. এ হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। একই দিন বাদ আসর চুনতী সীরাত (স.) ময়দানে তারই ওস্তাদ আলহাজ্ব হযরত মৌলানা আবদুর রশিদ সাহেবের ইমামতিতে জানাজা শেষে চুনতির ঐতিহ্যবাহী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।


তথ্যসূত্রঃ লিখেছেন- হাফেজ মোহাম্মদ আমান উল্লাহ, দৈনিক আজাদী(১৭ নভেম্বর ২০০৭ ইং)

About the author

lohagarabd

Leave a Comment